জয়-পরাজয়ের প্রধান ইস্যু করোনা মহামারি!

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২০, ২২:৩৫

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে সারা বিশ্বেই আলোচনা। এই ভোট বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রেসিডেন্ট ভোটাভুটির পদ্ধতি থেকে ভিন্ন। কেবল সে কারণেই আলোচনার বিষয় নয়; এই নির্বাচনের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন ইস্যু তথা অর্থনীতি, জলবায়ু, অভিবাসন ও উদারনৈতিক গণতন্ত্রের গতি-প্রকৃতির ভবিষ্যত্ নির্ধারিত হয় বলে মনে করা হয়। এবার নতুন করে মার্কিন নির্বাচনের প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠছে করোনা ভাইরাস। এটা একদিকে ট্রাম্পের জন্য দুর্ভাগ্য এবং বাইডেনের জন্য সৌভাগ্যের দ্বার উন্মোচন করতে পারে। করোনার মধ্যেও অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ায় দ্বিতীয়বারের মতো জয়ের আশা করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আর বাইডেনের ভরসা জলবায়ু, অভিবাসন ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা।

বড় ইস্যু করোনা মহামারি :করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা—দুই দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে এক নম্বরে। ৯০ লাখেরও বেশি মানুষ সংক্রমিত হয়েছে এবং মারা গেছে ২ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি। প্রতিদিন প্রায় ৯০ হাজার আমেরিকান নতুন করে করোনায় সংক্রমিত হচ্ছে। মার্কিন বিশ্লেষকদের মধ্যে বড় কোনো দ্বিমত নেই যে যুক্তরাষ্ট্রে এবারের ভোটে এক নম্বর ইস্যু করোনা। করোনা মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যর্থতার জবাব ব্যালটের মাধ্যমেই পাওয়া যাবে বলে ট্রাম্প সমালোচকদের ধারণা। ৯ কোটি ৩০ লাখের বেশি আগাম ভোট পড়েছে, যা ২০১৬ সালে দেওয়া মোট ভোটার উপস্থিতির ৬৭ শতাংশের বেশি।

ওয়াশিংটনের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জো গার্সটেনসন বলেছেন, করোনা মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাজে অধিকাংশ আমেরিকান অখুশি। সর্বশেষ জনমত জরিপের প্রতি ১০ জন আমেরিকানের সাত জনের মতে, কোভিড-১৯ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ‘ভুল বার্তা’ দিচ্ছেন। তবে রিপাবলিকান সমর্থকদের সিংহভাগই এ ব্যাপারে ট্রাম্পের পেছনে আছেন। গার্সটেনসন বলেন, শুধু যে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে মতামতে ভিন্নতা তা নয়, এলাকার ভিত্তিতেও জনমত ভিন্ন। যে এলাকার মানুষ মহামারিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তারা ক্ষিপ্ত। উদাহরণস্বরূপ, বছরের শুরুতে অ্যারিজোনায় জনমত জরিপে বাইডেন খুব সামান্য এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু গ্রীষ্মে ঐ রাজ্যে কোভিড-১৯ ভয়ংকর রূপ নেওয়ায় বাইডেনের সমর্থন অনেক বেড়েছে।

উইসকনসিনে ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামান্য ব্যবধানে জিতেছিলেন। এবারও অধিকাংশ সময় ট্রাম্পের সমর্থনে ভাটা দেখা যায়নি। কিন্তু অক্টোবরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় উইসকনসিনে ট্রাম্পের চেয়ে ৭ থেকে ১৭ পয়েন্ট এগিয়ে বাইডেন। ঐতিহাসিকভাবে রিপাবলিকানদের অন্যতম ঘাঁটি টেক্সাসেও ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পকে নিয়ে বিরূপ মনোভাব স্পষ্ট হচ্ছে। কারণ দুই দফা সংক্রমণে টেক্সাস বিপর্যস্ত।

অর্থনীতি, জাতীয়তাবাদ, জলবায়ু, অভিজ্ঞতাও কম নয়

করোনায় মার্কিন অর্থনীতি ভয়াবহ মন্দার কবলে। চাকরি হারায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ। কিন্তু গত মে মাসে লকডাউন উঠে যাওয়ার পর অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩৩ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৯ সালের শেষের চেয়ে এখনো ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কম। চাকরি পেয়েছেন ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ। মুডির তথ্যমতে, অর্থনীতির পার্থক্যটা রয়েছে ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের, যা এক বিরাট ক্ষতি। মার্কেট ওয়াচ বলছে, বছরের শেষ দিকে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশ বাড়বে। তবে সব জরিপই বলছে, করোনায় অর্থনীতির ক্ষতি হলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পদক্ষেপে তা দ্রুত উন্নতি লাভ করেছে। কেবল অর্থনীতি নয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আরেকটি ভরসা জাতীয়তাবাদ। ট্রাম্পের আমলে চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যযুদ্ধের মাধ্যমে অর্থনীতি যে কিছুটা হলেও শক্তিশালী হয়েছে, তা-ও স্বীকার করছেন অর্থনীতিবিদেরা। যদিও কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন অর্থনীতি শক্তিশালী করতে বিভিন্ন সংস্থায় তহবিলও কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি আমেরিকান ফার্স্ট নীতিকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ইসরাইলের সঙ্গে মুসলিম দেশগুলোর সম্পর্ক গড়তে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ফলে ইসরাইলি ইহুদিদের বেশির ভাগই ট্রাম্পকে সমর্থন করছেন। তবে জলবায়ু, অভিবাসন ও অভিজ্ঞতার ইস্যুতে এগিয়ে বাইডেন। জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এতে পরিবেশবাদীরাসহ অনেক প্রভাবশালী দেশই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর ক্ষুব্ধ। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি ক্ষুব্ধ। সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানা যায়, বাইডেন জয় পেলে খুব দ্রুত ন্যাটো প্রতিনিধিরা তার সঙ্গে বৈঠক করবেন। আর ট্রাম্প জিতলে সেটা এত দ্রুত হবে না। কারণ ট্রাম্প তার আমলে ন্যাটোর গুরুত্ব অনেকখানি হ্রাস করেছেন বলেই পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা। তিনি ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে সামরিক ব্যয় বাড়াতে চাপ দিয়েছেন, যাকে ইউরোপের প্রধান কয়েকটি মিত্র দেশ ভালোভাবে নেয়নি। তারা যে ট্রাম্পকে বাদ দিয়ে বাইডেনকে চাইবে, সেটা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। বাইডেন মনে করেন, তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে তাকেই বসাবেন মার্কিনিরা। তিনি একাধারে কয়েকবার সিনেটর এবং দুইবার ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে এই সময়ে তার ছেলে হান্টার বাইডেনের দুর্নীতি ইস্যুতে জোরেশোরে প্রচারণা চালিয়েছে ট্রাম্প শিবির। —রয়টার্স, সিএনএন ও বিবিসি