করোনাকালে সহিংসতা বৃদ্ধি

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২০, ২১:৩০

করোনাকালে অপরাধের সংখ্যা বেড়েছে গোটা বিশ্বে। মনস্তত্ত্ববিদগণ এর পিছনে মন-সামাজিক কারণ খুঁজে পাচ্ছেন। অপরদিকে একজন করোনা রোগীও নানানরকম তাচ্ছিল্যের এবং আক্রমণের শিকার হচ্ছে  যার কারণে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। করোনাকালে গোটা বিশ্বেই সহিংসতা এক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। অসভ্য বর্বর আচরণ করছে সমাজের কিছুসংখ্যক মানুষ। এমন নয় যে, করোনার আগে পৃথিবী স্বর্গরাজ্য ছিল কিন্তু করোনাকালে সংঘাত যেন বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। অতি সম্প্রতি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে—লালমনিরহাটে এক জনকে নৃশংসভাবে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে, সাভারে যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূ খুন হয়েছে, ধামরাইয়ে এক জন খুন হয়েছে, কিশোরগঞ্জে তিন জনকে হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরে এক জন খুন হয়েছে, নীলফামারীতে এক জন খুন হয়েছে, নোয়াখালীর সেনবাগে এক জন খুন হয়েছে—এসব খবর। এমনকি ছেলে মাকে হত্যা করার মতো ঘটনা দেশে ঘটেছে। সম্প্রতি করা কয়েকটি বিদেশি গবেষণায় কোথাও কোভিড-১৯-পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে ২৫ শতাংশ, আবার কোথাও ৫০ শতাংশের মতো পারিবারিক সহিংসতা বাড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। কোনো কোনো দেশে নারীকে এ বিষয়ে সহায়তার জন্য বিশেষ হেল্পলাইন চালু হয়েছে। অ্যামেরিকার পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়া যাক। বহু অন্যায়, বহু অপরাধ হয়েছে; কিন্তু কোনো কিছুই এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে, ‘ব্ল্যাক লাইভ ম্যাটার্স’-এর মতো একটি লাগাতার আন্দোলন গড়ে উঠেছে? শুধু কলম্বিয়ায় করোনাকালে পারিবারিক হিংসা বেড়েছে ৫০ শতাংশ। নারীকে খুন করার পরিমাণ ভেনেজুয়েলায় বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। মেক্সিকোয় পুলিশের ইমার্জেন্সি কলের সংখ্যা বেড়েছে ৫০ শতাংশ। আফ্রিকায় বেড়েছে মেয়েদের ওপর নির্যাতন। ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান এমনকি জার্মানির মতো দেশেও খাদ্যের অভাবে পরিবারে আত্মহত্যা বেড়েছে, কিংবা বাবা অথবা মা হত্যা করছেন ছেলেমেয়েদের—এমন খবরও মাঝেমধ্যেই শোনা যায়। ধর্ষণ, খুন, রাহাজানি ভারতীয় উপমহাদেশের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা; কিন্তু করোনাকালে তা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন শহরে ক্রাইম রেট চোখে পড়ার মতো বেড়েছে।

করোনাকালে মানুষ কাজ না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। কাজ হারানো মানুষ বুঝতে পারছেন না কীভাবে সংসার চলবে। যাদের কাজ আছে, তারা বুঝতে পারছেন না আগামীকাল তা থাকবে কি না—এই পুরো বিষয়টি মানুষের মনে প্রভাব ফেলছে। মানুষ মানসিকভাবে হিংস্র হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। গত প্রায় পাঁচ মাসের তথ্য সে কথাই খাতায়-কলমে স্পষ্ট করছে। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর কারণে মানুষের আচরণ পরিবর্তিত হচ্ছে। সহ্যক্ষমতা কমে যাচ্ছে, চাহিদার সঙ্গে প্রাপ্তির সমন্বয় না ঘটায় আগ্রাসী আচরণ করছে কেউ কেউ। ঘরে থাকতে থাকতে বিবাদে আর তর্কে জড়িয়ে পড়ছেন অনেকেই। সেখান থেকে বাড়ছে পারিবারিক সহিংসতা। নারীর প্রতি আক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে বলে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে। অপরাধ পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পারিবারিক সহিংসতা ও সংঘবদ্ধ অপরাধে হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা দিনদিন বাড়ছে। বিশেষ করে করোনাকালে নৃশংসতার ঘটনা বেড়েছে আগের চেয়েও বহু গুণ।

এনডিউরিং লাভ বইয়ে অধ্যাপক জ্যাকুই গ্যাব তার গবেষণার ফল উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘যে পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দুই জনেই কাজ করতেন, করোনাকালের আগে তারা জেগে থাকা অবস্থায় গড়ে দৈনিক ১৫০ মিনিটের মতো সময় একসঙ্গে কাটাতেন, যার বড় একটা অংশই ছিল দুই জনে মিলে টিভি বা মুভি দেখা; কিন্তু এই করোনাকালে পরস্পরকে গুণগত সময় দেওয়ার সুযোগ এসেছে। একে অপরকে নতুন করে চিনতে শিখুন। সময়টাকে কাজে লাগালে মানসিক প্রশান্তি মিলবে।’ নিজেকে যত চিনতে পারা যায়, তত অপরের প্রতি অনুভূতিগুলো প্রখর হয়। তাই নিজেকে সময় দিয়ে এবং নিজেকে নিয়ে ভেবে নিজের আসল রূপের পরিবর্তন করা সম্ভব। পরিবারের নারী-পুরুষ, ছোট-বড়—সবাই ঘরের কাজে, যার যার সামর্থ্য মতো অংশ নিলে এতে পারস্পরিক মমতা বাড়ে। প্রত্যেকের চিন্তার জগত্ আলাদা। এটা মেনে নিতে পারলে দ্বন্দ্ব হওয়ার আশঙ্কা কম। সবাই যে কোনো বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উত্তম। এ প্রসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘এ ধরনের মহামারিতে মানুষের আচার আচারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যে কোনো মহামারিতে বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে মানুষের আচারণ উদ্বেগ-উত্কণ্ঠাসহ মানসিক চাপ বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। বর্তমান এই মহামারি পরিস্থিতি অত্যন্ত ধৈর্য ও দৃঢ় মনোবলের সঙ্গে বাস্তবতা মোকাবিলা করার মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।’

মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয়ের উল্লেখযোগ্য সূচক হচ্ছে অপরকে সম্মান করা। পরিবারের অন্যান্য সদস্য, বিশেষ করে নারীর প্রতি সম্মান জানানোর এটাই উপযুক্ত সময়। এই সুযোগ আপনার জীবনে আর কখনো নাও আসতে পারে। ঘরে থেকে অথবা কোয়ারেন্টাইনে থাকার সময় আমরা যদি ইতিবাচকভাবে ভাবতে পারি, তাহলে কিন্তু দ্বন্দ্ব আর সংঘাতের বদলে পারিবারিক সম্পর্কগুলোকে আরো দৃঢ় করা সম্ভব। করোনা ভাইরাস আমাদের থেকে কেড়ে নিচ্ছে আপজনকে আবার কঠিন শিক্ষাও দিচ্ছে; কিন্তু এই সময়ে ধৈর্য ধারণ ও সহিংসতা পরিহার করে ইতিবাচক সামান্য অর্জনও যদি করা যায়, তবে তা করোনা-পরবর্তী পৃথিবীকে আরো সুন্দর করে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

n লেখক:ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা