টেকনাফে নারী-শিশু মাদক চোরাকারবারি বাড়ছেই

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২০, ২২:৪২

মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডের জের ধরে কক্সবাজার জেলা পুলিশকে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যে একযোগে বদলির পর এখনো পুলিশের কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়নি। এই সুযোগে টেকনাফের প্রত্যন্ত এলাকার মাদক কারবারি, অবৈধ অস্ত্রধারী, ডাকাত, অপহরণকারী ও মুক্তিপণ আদায়কারী চক্র বেপরোয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক দুর্বৃত্তদের অপতত্পরতা। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মাদক চোরাকারবারিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিশু-কিশোর ও নারী মাদক কারবারিদের সংখ্যা।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, টেকনাফের প্রতিটি গ্রামে কম-বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মাদক চোরাকারবারি রয়েছে। মাদক চোরাচালানে নগদ টাকা আয়ে লোভাতুর হয়ে পড়ে মাদক চোরাকারবারিদের স্ত্রীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন বয়সের নারী, শিশু-কিশোরেরা মাদকের চালান বহন করছে। অনেক নারী, শিশু-কিশোর ঢাকা, কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, টেকনাফসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হয়ে কারাগারে রয়েছে। আবার অনেকে জামিনে এসে এখনো নানা অপতত্পরতায় লিপ্ত হচ্ছে। চিহ্নিত মাদক কারবারিদের অনেকে সরকারি-বেসরকারি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের ছত্রছায়ায় থাকেন। এছাড়া বিভিন্ন পেশার আড়ালে এবং সশস্ত্র গ্রুপের সদস্য হওয়ায় সাধারণ মানুষ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পায় না।

বিভিন্ন এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপকালে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিভিন্ন স্থানে মাদক কারবারিদের ছত্রছায়ায় শিশু-কিশোর ও নারী মাদক চোরাকারবারিদের সংখ্যা বৃদ্ধি উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করা না হলে এবং এই তত্পরতা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরো ভয়ানক হতে পারে।

উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের চাকমারকূল গ্রাম থেকে শুরু করে শাহপরীর দ্বীপের ঘোলাপাড়া এবং নাফ নদীর উপকূল থেকে বাহারছড়া উপকূলীয় ইউনিয়ন পর্যন্ত ১৪৩টি গ্রাম ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিশু-কিশোর, মহিলা মাদক চোরাকারবারি ও বহনকারীদের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। গত সাত-আট মাসে করোনা ভাইরাসের কারণে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক ছাত্র মাদকসংশ্লিষ্ট বন্ধুদের সংস্পর্শে গিয়ে বিপথগামী হয়ে উঠছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে। 

কম্বনিয়াপাড়ার এক ব্যক্তি বলেন, অভাবের তাড়নায় অত্র এলাকা ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের মাদক কারবারিদের ইয়াবা ও চোলাই মদের চালান বহন         করতে গিয়েই এই গ্রামের শতাধিক নারী ও কিশোর মাদক মামলায় আসামি হয়েছে।

মরিচ্যাঘোনার এক ব্যক্তি জানান, এই গ্রামে মাদক কারবারিদের সশস্ত্র শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। অভিযান পরিচালনাকারী প্রশাসনের কতিপয় সদস্যকে বশে আনতে রূপসী নারীদের কৌশলে ব্যবহার করে থাকে। পানখালীতেও সুদর্শনা নারী মাদক কারবারি সিন্ডিকেট রয়েছে। হ্নীলা পশ্চিম সিকদারপাড়ায় মালয়েশিয়া প্রবাসী ঈসমাইলের স্ত্রী রেহেনা এখনো চার-পাঁচ জনের সিন্ডিকেট নিয়ে নয়াবাজার থেকে মাদকের চালান সংগ্রহ করে।

ফুলের ডেইল গ্রামেও এখনো পর্যন্ত কয়েক জন নারী মাদক বিক্রেতা সক্রিয় থাকার পাশাপাশি ছয়-সাত জনের একটি যুব সিন্ডিকেট রয়েছে। তারা এখনো কৌশলে মাদকের চালান পাচার করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এছাড়া রঙ্গিখালী থেকে দমদমিয়া ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক নেতা বলেন, এখানে কার কথা কে শোনে। যার যা ইচ্ছে তাই করে বেড়ায়। মাদকের চালান বহন এই ক্যাম্পের মানুষের জন্য সাধারণ বিষয়। মাদকের চালান নিয়ে শতাধিক রোহিঙ্গা নারী বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে রয়েছে। অনেকে ইতিমধ্যে কারাভোগ করে ফিরেছে।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি (তদন্ত) আব্দুল আলিম জানান, মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার রয়েছে। তবে মাদক কারবারি যে-ই হোক, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে আরো কঠোর অভিযান জোরদার করা হবে।

টেকনাফ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অস্থায়ী জোনের সহকারী পরিচালক দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান জানান, ‘আমরা বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধানে জানতে পারি, ইদানীং মাদক কারবারের মূল হোতারা কৌশলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ রোহিঙ্গা ও স্থানীয় নারীদের লোভ দেখিয়ে মাদক কারবারে সম্পৃক্ত করেছে। গত দুই-তিন মাসে আমরা সাত-আট জন মহিলা মাদক কারবারিকে আটক করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের এই অভিযান ভবিষ্যতে আরো জোরদার করা হবে।