এক সকালের ঘটনা। একটি টেলিকম কোম্পানীর কর্মকর্তা জাবেদ চৌধুরীর কাছে সংবাদ এলো একটি দুর্ঘটনার। তার বাসায় কাজ করতে আসতেন বানু। সেদিন সকালে ফুটপাতে খেলতে গিয়ে বানুর ছোট্ট শিশুটি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। এ ঘটনায় মুষড়ে পড়েছিলেন তিনি। এ সময়গুলোতে বস্তি এলাকায় যাওয়া শুরু করেন তিনি। সেখানে শিশুদের সঙ্গে মিশতে শুরু করেন। তাদেরকে বোঝাতে শুরু করেন ট্রাফিক আইন, নিয়ম-কানুন। কিন্তু অক্ষরজ্ঞান না থাকায় তাতে কোনো ফল হলো না। তখন বস্তি এলাকার শিশুদের নিয়ে কিছু করার চিন্তা শুরু করেন এই তরুণ। এভাবেই শুরু ‘বাঙলার পাঠশালা’। এখানেই শেষ নয়, বাঙলার পাঠশালা শুরু থেকে বস্তি এলাকায় পড়ানোর পাশাপাশি সেমিনার করতো তারা। পরবর্তী সময়ে বৃহত্ আকারে দাঁড়িয়ে গেলে সংগঠনের পৃথক নাম দেন ‘শক্তি বিদ্যালয়’।
রাজধানীর বস্তি এলাকা ও নিম্নবিত্ত এলাকাগুলোতে ৯টি বিদ্যালয় আছে জাভেদের। এ ৯ বিদ্যালয়ের ৬টি বিদ্যালয় এখনও চলমান। অর্থের অভাবে বন্ধ করে দিতে হয়েছে ৩টি। রাজধানীর এ ৯ বিদ্যালয় থেকে উপকৃত হয়েছে সাড়ে ৫ হাজারেরও বেশী শিক্ষার্থী ও ১২ হাজার পরিবার। মিরপুর-১ এর চিড়িয়াখানা রোডে ও গুদারাঘাট এলাকায়, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী আদাবরে, গুলশান কড়াইল বস্তিতে, সায়দাবাদ বাসস্ট্যান্ডের কাছে দয়াগঞ্জে বিদ্যালয়গুলো চালু আছে।
পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা জাভেদ চৌধুরী প্রথমদিকে টেলিকম প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত অবস্থায় বস্তির শিশুদের নিয়ে সপ্তাহের ছুটির দিনে পড়াতে যেতেন তিনি। তখন সপ্তাহে একদিন স্কুল দেখে সবাই অবাক হয়েছিল। নিজে একটা বোর্ড ও মার্কার কিনে নিয়ে ঘুরেছেন ছুটির দিনগুলোতে। আর অনেকগুলো বস্তির মাঝখানে ফাঁকা পড়ে থাকা খালি জায়গাগুলোতে শিশুদের নিয়ে পড়াতেন তিনি। সেখানে তাদের অক্ষরজ্ঞানের পাশাপাশি শেখানো হতো সীমিত আকারের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের মধ্য দিয়ে কিভাবে পুষ্টিগুণ সমদ্ধ খাবার খাওয়া যায়।
ইচ্ছে মেয়েদের এগিয়ে নেওয়ার
বস্তি এলাকার বেশ কিছু সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন জাভেদ। মেয়েদের সমস্যার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রথমদিকে মেয়েদের সম্পৃক্ততা বেশী থাকে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যতই উপরের দিকে যাওয়া যায় সবার আগে মেয়েরা ঝরে পড়ে। সামাজিক পুনরুত্পাদনের (সন্তান জন্মদান, গৃহস্থালির কাজ ইত্যাদি) মতো কাজের জন্য তারা আর পাঠ্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে না। এর ফলে মেয়েরা শিকার হয় বাল্যবিবাহের। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে প্রাথমিক পর্যায়ে মেয়েদের সম্পৃক্ততা বেশী। সেই মেয়েরা কিন্তু অপুষ্টিতে ভুগছে, বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। সেই মেয়েরাই তাদের স্বপ্নকে উপরের দিকে নিয়ে যেতে পারছে না। আমার উদ্দেশ্য ছিল এই মেয়েদের সক্ষম করে তুলব। বন্ধুত্ব থেকেও মানুষ সক্ষমতা তৈরি করতে পারে। আমি আমার সে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।
তিনি বলেন, বস্তির মানুষরা সবচেয়ে নিগৃহীত হলেও তাদের মধ্যে সবচেয়ে নিগৃহীত বস্তির মেয়েরা। আমি তাদের নিয়ে কাজ করার চিন্তা-ভাবনা শুরু করলাম। রাষ্ট্রের যে বৈষম্য, বাধা সেগুলো কাটানোর জন্য শুধু মিছিল মিটিং নয়, আমাকে মানুষদের সক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে।
আর্থিক সহায়তার উৎস
সংগঠনের আর্থিক সহায়তার বিষয়ে বলতে গিয়ে তিনি শুরু করলেন ২০০৮ সালের ঘটনা থেকে। ২০০৮ সালে সপ্তাহের শেষ দিনটায়, সাধারণত ছুটির দিনগুলোতে— একটা সাদা বোর্ড আর একটা মার্কার পেন নিয়ে পড়াতে যেতাম। তখন উঠানে বসতাম এবং পরবর্তী সময়ে ওরা আমাকে ভালোবেসে এক ঘণ্টা বা দুই ঘণ্টার জন্য একটা ঘর খালি করে দিত। আমার এক ছাত্রীর বাবা একটি ব্যাংকের পরিচালক। তিনি যখন জানতে পেরেছেন আমার এ কাজের বিষয়ে তখন তিনি বললেন, আপনি আরও ভালোভাবে কাজটা করতে পারেন— বাংলাদেশ ব্যাংকের একটা বাধ্যবাধকতা আছে। দরিদ্র ও বঞ্চিতদের জন্য কিছুটা বাধ্যবাধকতা আছে ফান্ড খরচের জন্য; এটাকে বলে সামাজিক দায়বদ্ধতা।
সেখানে আমি আবেদন করলাম। ব্যাংকের লোকজন এলেন। সেখান থেকে তারা আমার ২টি শাখায় অর্থায়ন করতে চাইলেন। তারপর তাদের আমার সঙ্গে একটা সম্পর্ক হলো। তাদের ভালো লাগায় এবং অর্থায়নের আশ্বাসে আরও দুটি শাখা চালু করলাম।
পরবর্তী সময়ে আব্দুল মতিন, শহীদ খালেক ও মেজর সালেক বীর উত্তম ট্রাষ্টের চেয়ারম্যান পঞ্চম শাখার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন।
বস্তিবাসীদের খাদ্য ও পুষ্টি নিয়েও তিনি কাজ করেন। বস্তিবাসী অভিভাবকদের সামর্থ্য নেই সন্তানদের ব্যয়বহুল খাবার খাওয়ানোর। সেজন্য কিভাবে অল্পব্যয়ে তাদের সঠিক পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবার সরবরাহ করা যায় সেই চিন্তাও শুরু করেন জাভেদ। তিনি জানান, প্রথমদিকে শিশুদের কিছু শেখালে তারা ভুলে যেত। আমরা খেয়াল করে দেখলাম— পুষ্টিকর খাবারের অভাবে তাদের এমন সমস্যা হচ্ছে। পরে আমরা তাদের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিলাম। ভাবলাম, ১০ টাকা দিয়ে একটি পুরি খাওয়ার চাইতে একটি ডিম খেলে তারা আরো বেশী ক্যালরি পাবে, তারা আরো বেশী সুস্থ থাকবে। আমরা তাদের বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করলাম। তারা বুঝল। এভাবেই আমরা এগিয়ে যেতে থাকলাম। এরপর তাদের জন্য আমরা একটি চার্ট তৈরি করি।
জানা যায়, ‘শক্তি কেয়ার’ প্রোগ্রামের আওতায় তারা এসব কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
ইত্তেফাক/জেডএইচডি
