সবেধন নীলমনি, আমাদের এই নীল গ্রহের একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ হচ্ছে চাঁদ। পৃথিবী থেকে ৩৮৪৪০৩ কিলোমিটার অর্থাত্ ২৩৮৮৫৭ মাইল দূরে, তিনদিনের পথ। পৃথিবীতে মানুষেরা পদচারণা শুরুর পর থেকে অবাক বিস্ময়ে চাঁদকে দেখেছে। তাঁদের কল্পনার জগতে নানা রকম কল্পকাহিনির উত্স ছিল এই উপগ্রহটি। আজ এমন কাউকে পাওয়া যাবে না যে কি না চাঁদের দেশে ‘চরকা কাটা বুড়ি’র কথা বিশ্বাস করে।
২০ জুলাই ১৯৬৯ তারিখে প্রথম মানুষ চাঁদের মাটিতে পা রাখে। গেল বছর ২০১৯ পৃথিবীর সব দেশেই চন্দ্রজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পালন করা হয়।
জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত জাতিগুলো মহাকাশ অভিযানে নিজেদের মেধা, শক্তি আর সম্পদ নিয়ে প্রচণ্ড উত্সাহী। সে কারণেই যাতে মহাকাশকে নিজেদের একচেটিয়া দখলে নিতে না পারে সেদিকে খেয়াল রেখে ১৯৬৭-তে মহাকাশ বিষয়ক এক চুক্তি সম্পাদিত হয়। তাতে বলা হয়, সমস্ত দেশের স্বার্থে মহাকাশ গবেষণা পরিচালিত হবে। আমাদের গ্রহের বাইরে সব স্থান হবে ‘সমগ্র মানবজাতির জন্য’। এমন চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশের সংখ্যা ২০১৯-এ এসে দাঁড়িয়েছে ১০৯টি। আরো ২৩টি দেশ চুক্তিবদ্ধ হওয়ার অপেক্ষায় আছে। ৫ ডিসেম্বর ১৯৭৯-তে জাতিসংঘের তদারকিতে চাঁদের ভাগাভাগি নিয়ে আবারো আরেকটি চুক্তি করা হয়, সেখানে কাউকে একক অধিকার দেওয়া হয়নি।
মানুষের স্থায়ী বসবাসের জন্য জরুরি হচ্ছে পানি, অক্সিজেন আর শক্তির উত্স। ২০০৮-২০০৯ সালে ভারতের মানুষ বিহীন চন্দ্রযান-১ চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে প্রচুর পানি রয়েছে বলে সুখবরটি দিয়েছে। এর আগে অবশ্য সোভিয়েত লুনা ২৪ চাঁদের মাটির যে নমুনা এনেছিল তাতে পানির সন্ধান পাওয়া গেছে। নাসা জানিয়েছে চাঁদের দুই মেরুতে অন্তত ২৯০ কোটি মেট্রিক টন বরফ আছে। তাছাড়া চাঁদে অক্সিজেনের ব্যবস্থাও হবে। হাইড্রোজেন এবং অবারিত সূর্যালোক জোগাবে শক্তি। আরো আছে শক্তির চমত্কার উত্স হিলিয়াম-৩।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে চাঁদে মানুষের স্থায়ী বসবাস, গবেষণা, মূল্যবান খনিজ আরোহনের জন্য দিন-তারিখও নির্দিষ্ট করে ফেলেছে। আগামী ২০২৪ সালে চাঁদে মানুষ যাবে প্রাথমিক আস্তানা গড়তে এবং ২০২৮ থেকে সেখানে মার্কিনিদের অবস্থান স্থায়ী হবে। রাশিয়া ২০২৫-এ চাঁদে উপনিবেশ গড়ার কাজে হাত লাগাবে এবং ২০৪০ থেকে তাদের দেশের কিছু নাগরিক সেখানে স্থায়ী হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন যে চাঁদের মাটিতে প্রথম ভারতীয়রা হাঁটাহাঁটি করবে ২০২২-এ।
চাঁদে আছে মূল্যবান এবং বিরল খনিজ। সিলিকন, বিরল মৃত্তিকা, টিটানিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম এবং আরো অন্যান্য মূল্যবান খনিজ। বিশেষ করে হিলিয়াম-৩ ও প্লেটোনিয়ামের জন্যই পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। পৃথিবীতে এক কেজি প্লেটোনিয়ামের দাম বিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার মার্কিন ডলার। আর অ-তেজস্ক্রিয় হিলিয়াম-৩, পরিবেশবান্ধব শক্তির এক চমত্কার এবং বিস্ময়কর উত্স। আমাদের পৃথিবীতে হিলিয়াম-৩ নাই বললেই চলে। অথচ চাঁদে কম করে হলেও এক লাখ টন হিলিয়াম-৩ রয়েছে। সৌর-বায়ু আমাদের এ উপগ্রহে এমন সম্পদের সমাহার ঘটিয়েছে।
চীনের লুনার এক্সপ্লোরেশন প্রোগ্রামের প্রধান বিজ্ঞানী অধ্যাপক ওয়্যাং জিয়াউয়ান বলেছেন, ‘চাঁদ হিলিয়াম-৩-এ এতটাই সমৃদ্ধ যে এটি কমপক্ষে দশ হাজার বছর ধরে পৃথিবীর মানুষের শক্তির প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে পারবে।’ পরিবেশের দূষণ না ঘটিয়ে পৃথিবীর সব কাজকর্ম চলবে—এ এক অকল্পনীয় ব্যাপার। পরিবেশ নিয়ে যাঁরা খুব চিন্তাভাবনা করেন, তাঁরা এমনটা ভাবতেই উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন, আশার আলো দেখছেন। কারণ আজ পর্যন্ত জানা প্রযুক্তির কল্যাণে চাঁদে আসা-যাওয়ার খরচ অনেক কমে এসেছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে। তাই স্থায়ী মানব বসতি স্থাপন আর সেখান থেকে খনিজ সম্পদ আরোহন এখন মোটেই কল্পনানির্ভর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি নয়।
