ছোট্ট একটি কন্যাশিশু জন্মের পরপরই বাবাকে হারাইয়াছিল। মা-ও থাকিয়া নাই, কোনো এক অভিযোগে কারাগারে বন্দি। শিশুটি বাড়িয়া উঠিতেছিল দাদির নিকটে। কিন্তু অভাবের সংসারে একটুখানি ভালো থাকিবার আশায় শিশুটিকে পরিচিত এক দম্পতির নিকট দত্তক দেওয়া হয়। বিধি বাম! সেই দম্পতি যেন শিশুটির সহিত ক্রীতদাসতুল্য আচরণ শুরু করে। শিশুটির বয়স এখন বড়জোর আট বত্সর হইলেও তাহাকে দিয়া সংসারের বিভিন্ন কায়িক শ্রমের কাজ করানো হয় এবং তাহাতে কোথাও ভুল হইলে ছোট্ট শিশুটির উপর নামিয়া আসে অকথ্য নির্যাতন। দীর্ঘদিন ধরিয়া তাহাদের প্রতিবেশী এক সচেতন নারী উহা পর্যবেক্ষণ করিয়া অবশেষে পুলিশের ৯৯৯ সেবা নম্বরে কল করেন এবং উহার পর গুলশান থানাপুলিশ ঘটনাস্থলে আসিয়া শিশুটিকে উদ্ধার করে। শিশুটিকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে।
ঘটনার এতখানি বিস্তারিত বর্ণনা এই কারণে দিতে হইল যে, এই ধরনের নির্যাতনের ঘটনা আমাদের দেশে নূতন নহে। কিন্তু প্রযুক্তির সুবিধা আমাদের আজ নূতন দিগন্তে লইয়া যাইতেছে। বলা যায়, জাতীয় জরুরি সেবা হেলপ ডেস্ক ৯৯৯ একের পর এক চমক দেখাইতেছে। অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের কল পাইয়া তাত্ক্ষণিকভাবে তাহারা সাড়া দিতেছে। আমরা দেখিয়াছি, ইতিমধ্যেই এই সেবায় বলিবার মতো এমন অনেক গল্প তৈরি হইয়াছে, যাহা আমাদের হূদয়কে আর্দ্র করিয়া দেয়। দুর্ঘটনায় সহায়তা, বাল্যবিবাহ রোধ, ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার, গৃহকর্মী নির্যাতন রোধ, পারিবারিক নির্যাতন বন্ধ ইত্যাদি সমস্যায় ৯৯৯ অভাবিত প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখিতেছে। এমনকি পুরাতন গাছ উদ্ধার কিংবা উঁচু দালানের কার্নিশে আটকা পড়া বিড়াল উদ্ধারেও ভূমিকা রাখিয়াছে ৯৯৯। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে এই সেবা কার্যক্রম শুরুর পর হইতে এই বত্সরের প্রথমাংশ অবধি ৯৯৯ নম্বরে মোট ১৬ কোটি ২৩ লক্ষ ১১ হাজার ৩১টি কল করা হইয়াছে। ইহার মধ্যে জরুরি কলের সংখ্যা বিপুল। এই সংখ্যাই বলিয়া দিতেছে মানুষ কত ধরনের বিপদের মধ্যে দিনাতিপাত করে। অর্থাত্ চারিদিকে কতশত বিপদই-না ওত পাতিয়া রহিয়াছে! পুলিশই সেইখানে সবচাইতে ভরসাস্থল হওয়া উচিত। যদিও এই উপমহাদেশের জনমানসে পুলিশ বহুকাল ধরিয়া বহু ক্ষেত্রেই মূর্তিমান আতঙ্কের নাম ছিল। প্রবাদ আছে—বাঘে ছুঁইলে আঠারো ঘা, আর পুলিশে ছুঁইলে ছত্রিশ ঘা। তাহার কারণ হইল, আমাদের পুলিশের ভিতর হইতে আধাসামন্তবাদী ভাবমূর্তি এখনো পুরাপুরি দূর হয় নাই। তবে আস্তে আস্তে পুলিশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি বাড়িতেছে, ইহা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সভ্যতার বিকাশের সহিত মানুষ তাহার নিরাপত্তার বিষয়টি সবচাইতে বেশি গুরুত্ব দিয়া থাকে। তাহা জাতিগত ও ব্যক্তিগত—উভয় দিক হইতেই। উন্নত ও কল্যাণকর রাষ্ট্র তাহার জনগণের মধ্যে এই বিশ্বাস আরোপ করিয়া থাকে যে, কেহ বিপদে পড়িলে তাহাকে রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ সেবা প্রদানের চেষ্টা করিবে রাষ্ট্র। তথ্যপ্রযুক্তির জাদুতুল্য ব্যবস্থার হাত ধরিয়া উন্নত বিশ্ব আজ অভাবিত উচ্চতায় চলিয়া গিয়াছে। তাহাদের তুলনায় আমরা এখনো বহু ক্ষেত্রেই তিন-চার দশক পিছাইয়া রহিয়াছি। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ কথাটিও এক দশক ধরিয়া আমরা নিরন্তর শুনিয়া আসিতেছি। বাকি বিশ্বের সহিত তাল মিলাইয়া চলিতে হইলে বাংলাদেশেও ইহার দৃশ্যগত পরিবর্তনের বিকল্প নাই। সেই পরিবর্তন ধীরে হইলেও হইতেছে, ইহা কিছুটা স্বস্তির বটে।
