অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বলেছেন, বিচার বিভাগ যেভাবে চলছে, এভাবে চলতে থাকলে রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে যাবে। বিচার বিভাগ হলো রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভের একটি। তাই বিচার বিভাগ যদি দুর্নীতিগ্রস্থ হয়ে যায়, তাহলে কোনও কিছুই আর টিকবে না। তার মতে, ‘সবচেয়ে বড় বিষয় হলো বিচার বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত করা। বিচার বিভাগে দুর্নীতির সঙ্গে যারা যুক্ত আছেন, তাদেরকে অনতিবিলম্বে বের করে দিতে হবে।’ অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনের দশ বছর পূর্তিতে গতকাল সোমবার অনলাইন সংবাদ মাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে এসব কথা বলেন মাহবুবে আলম।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, গত ফেব্রুয়ারি মাসে বর্তমান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আদালতের দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলাম। আমার ওই বক্তব্যটা ছিল একটি মেসেজ। ওই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে এসব পদক্ষেপে সবকিছু হবে না, এর থেকেও কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা ও জেলহত্যা মামলা পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলাম। এছাড়া একাত্তরের মানবতাবিরোধীদের মামলা, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের দখলে থাকা বাড়ি উদ্ধারের মামলা পরিচালনা করেছি। পাশাপাশি সরকারের বেহাত হওয়া বহু সম্পত্তি উদ্ধারের মামলা এবং মামলা করে চাকরি ফিরে পাওয়ার বিরুদ্ধেও প্রচুর মামলা পরিচালনা করেছি। তিনি বলেন, আমার মনে হয়, এ ধরনের জায়গায় (অ্যাটর্নি জেনারেলের পদের প্রতি ইঙ্গিত করে) থাকলে হুমকি আসবেই। তাছাড়া, মানুষের মৃত্যু তো হঠাত্ সড়ক দুর্ঘটনা, ভূমিকম্প বা লঞ্চ ডুবিতেও হতে পারে। তাই মৃত্যু ভয়ে সবসময় আতঙ্কিত থাকলে কখনও তো কাজই করা যাবে না। তবে এসব হুমকির ফলে আমার নিজের স্বাধীনতা অনেকটা খর্ব হয়ে গেছে। রমনা পার্কের কাছেই থাকি। অথচ সন্ত্রাসীদের ভয়ে জীবনের নিরাপত্তার জন্য আমি একটি দিনও রমনা পার্কে হাঁটতে পারলাম না। এত বছর ধরে রমনা পার্কের পাশে থেকেও হাঁটতে পারলাম না। কোনও হোটেলে বা কোনও অনুষ্ঠানে যেতে পারি না। কেননা, সন্ত্রাসীরা কখন কোথায় ওঁত পেতে থাকে, তার কোনও ঠিক নেই।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, একবার একজন জজ নানা রকম মামলা করে তার চাকুরি ফেরত পেতে চেয়েছিলেন। ওই জজ মন্ত্রণালয় থেকেও আদেশ এনেছিলেন যেন তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাটি তুলে নেওয়া হয়। তবুও মামলাটি প্রত্যাহার করিনি। বরং সেই মামলায় আমি জয়লাভ করেছি।
মাহবুবে আলম বলেন, জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসেইন সাঈদীর ফাঁসি হওয়া উচিত্ ছিল, কিন্তু সেটা হয়নি। এ মামলায় ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন থেকে কিছু কাগজ দাখিল করা উচিত্ ছিল, কিন্তু তা তারা দেয়নি। সেই কাগজগুলো জোগাড় করার জন্য আমি নিজেই বরিশাল ও পিরোজপুর গিয়েছিলাম। তবুও সেগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, নানারকম আইনি কারণ দেখিয়ে দু’টি মিল (মসলিন কটন মিল এবং আলিম জুট মিল) সরকারের হাত ছাড়া হয়ে যায়। এতে করে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি পানির দামে বিক্রি হয়ে গেছে।
মাহবুবে আলম বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা ছিল শঙ্কার। কারণ, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলামের সময় আমি ছিলাম অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল। তাই অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর চিন্তা করেছি, মাহমুদুল ইসলামের মতো বিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ, সত্ এবং কর্তব্যনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি অ্যাটর্নি জেনারেলের পদটি যে পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে আমি হয়তো সত্ ও কর্তব্যনিষ্ঠ হতে পারলাম, কিন্তু তার মতো জ্ঞান তো আমার নেই। এক সময় ইন্টারমিডিয়েট (এইচএসসি) পরীক্ষায় মাহমুদুল ইসলাম তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। আর প্রথম হয়েছিলেন ড. কামাল হোসেন এবং দ্বিতীয় হয়েছিলেন মোকাম্মেল হক। তাই ভাবতাম, মাহমুদুল ইসলামের মতো একজন মেধাবীর কাছে আমি কিছুই না। অনেক বিচারককেও বলেছি, অ্যাটর্নি জেনারেল থাকাবস্থায় মাহমুদুল ইসলাম আপনাদের যেভাবে সহযোগিতা করেছেন, আমার ক্ষেত্রে সে ধরনের আশা করলে আপনারা আশাহত হবেন। কেননা মাহমুদুল ইসলামের মতো অ্যাটর্নি জেনারেল আগে আমি কোর্টে দেখিনি।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমার জন্মস্থান মুন্সিগঞ্জ। ওই এলাকার জনগণের ভালো করার জন্য আমি যদি কিছুই না করতে পারি, তাহলে আমার এত পড়াশোনা আর এত উচ্চ পদে থেকে কী লাভ হলো? তাদের সেবা করতে পারলেই আমার জীবনে পূর্ণতা আসবে। পরবর্তী সময়ে সুযোগ এলে এমপি প্রার্থী হিসেবে আবারও মনোনয়ন চাইব।
তিনি বলেন, আইনের অঙ্গনে আমার থেকে যারা জুনিয়র আছেন, তাদেরও তো আশা আকাঙ্ক্ষা রয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেল হওয়ার। আমি মনে করি, এ পদের জন্য এখনও অনেক যোগ্য ব্যক্তি আছেন।
প্রসঙ্গত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক সম্মান সম্পন্ন করেন। ১৯৬৯ সালে লোক প্রশাসন বিভাগ থেকে এমএ পাস করেন। এরপর ১৯৭২ সালের সিটি ল’ কলেজ থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেন তিনি। ১৯৭৩ সালে তিনি আইনজীবী হিসেবে আদালতে প্রাকটিস (এনরোলমেন্ট) শুরু করেন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি থেকে হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে মামলা পরিচালনা (এনরোলমেন্ট) করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হন। আর সর্বশেষ ২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।
