চলেই গেলেন প্রফেসর নুরুদ্দিন চৌধুরী

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২০, ২১:৫৪

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রফেসর এ জে এম নুরুদ্দিন চৌধুরী ঢাকার একটি হাসপাতালে মাস দেড়েক মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে মহান রাব্বুল আলামিনের সান্নিধ্যে চলে গেলেন। তার সুস্থতার জন্য আত্মীয়-অনাত্মীয়নির্বিশেষে সবাই দোয়া করেছেন। আমি নিজেও তার জন্য অনেক প্রার্থনা করেছি। আমার প্রত্যাশা ছিল তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু আমরা মালাকুল মউতকে ফেরাতে পারলাম না।

প্রফেসর নুরুদ্দিন চৌধুরীর একাডেমিক ক্যারিয়ার ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তিনি এসএসসি থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই প্রথম বিভাগ পেয়েছিলেন। ভালো রেজাল্টের জন্য পাকিস্তান আমলে তিনি ইন্টার-উইং স্কলারশিপ নিয়ে চীন ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি লন্ডনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিষয়ে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। এ ব্যাপারে থিসিসের মাঠকর্মের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে ডাটা সংগ্রহ করে তাকে সহায়তা করার কিছু সুযোগ আমি পেয়েছিলাম। উল্লেখ্য, নুরুদ্দিন সাহেব সংস্কৃতিমনা ছিলেন। তিনি গানবাজনা খুব পছন্দ করতেন। আগ্রাবাদের সরকারি বাণিজ্য কলেজের ছাত্র থাকাকালে তিনি বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করতেন। তার কণ্ঠ ছিল অত্যন্ত সুমধুর।     

কর্মজীবনে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। তিনি চবির বাণিজ্য অনুষদের নির্বাচিত ডিন এবং শাহজালাল হলের প্রভোস্টও ছিলেন। চবিতে বিবিএ শুরু করার ব্যাপারে তার উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। তিনি অসাধারণ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন কর্তব্য পালনের নানা পর্যায়ে। উপাচার্যের দায়িত্ব পালনের সময় অনেক প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হলেও তিনি কখনো এর সরব প্রতিবাদ করেননি। তাই তিনি সুদক্ষ প্রশাসক হিসেবে সফলভাবে তার মেয়াদকাল পূর্ণ করতে পেরেছিলেন।

তিনি সত্যের সাধক, নিষ্ঠাবান ও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। উপাচার্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কপর্দকও তিনি অন্যায়ভাবে খরচ করেননি। এ প্রসঙ্গে টাকা সাশ্রয়ের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। আগের উপাচার্য মহোদয় থেকে পাওয়া পুরোনো গাড়িই তিনি ব্যবহার করেছিলেন। ঐ গাড়ির সামনের গ্লাসটি ভাঙা ছিল। আমরা কয়েক জন সহকর্মী অনেক বুঝিয়ে তাকে রাজি করিয়েছি গ্লাসটি পরিবর্তন করার জন্য। উনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ব্যয়ে যে পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়েছেন, তা সবার জন্য অনুকরণীয়। দীর্ঘদিন যাবত্ প্রায় সব উপাচার্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন। আমার জানামতে, তার আমল থেকেই তিনি কষ্ট করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব রিসোর্স থেকে বেতন প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এজন্য অনেকের কাছেই তিনি প্রশংসিত হয়েছিলেন সে সময়। চাকরি বেচাকেনার কোনো প্র্যাকটিস তার আমলে ছিল না। যারা চাকরি পেয়েছেন তারা তাকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখেন। তিনি একজন স্বচ্ছ-পরিচ্ছন্ন মানুষের প্রতিচ্ছবি ছিলেন।

তিনি তার আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সড়ক হিসেবে পরিচিত ১ নম্বর সড়কটির মেরামতকাজ কণ্ট্রাক্টরকে না দিয়ে নিজেই  দেখভাল করেছিলেন। তিনি কাজ মজবুত করার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে ট্রাক্টর এনে রাস্তা মেরামতে ব্যবহার করেছিলেন। ফলে দীর্ঘদিন এ কাজে আর হাত দিতে হয়নি। সরকারি অর্থ ব্যয়ে তিনি যে সাশ্রয়ী মনোভাব দেখিয়েছেন, তা তার দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। 

তিনি একজন জ্ঞানী, দক্ষ ও নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষক ছিলেন। অত্যন্ত যত্নসহকারে ক্লাস নিতেন, পারতপক্ষে ক্লাস মিস করতেন না। তার এই গুণের কথা প্রকাশ পেত ছাত্রছাত্রীদের মুখে মুখে। এমনকি করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের ICUতে ভর্তিরত অবস্থায়ও বড় মেয়েকে তার ক্লাস নিতে না পারার অপারগতার কথা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে জানাতে বলেছিলেন। বাস্তবিকপক্ষে, তিনি একজন জাত শিক্ষকের দর্শন, আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করেছিলেন।

তার পিতা আলহাজ জহিরুল কাইয়ুম চৌধুরী এবং মাতা চেমন আরা বেগম। দুজনই জান্নাতবাসী হয়েছেন। তার পিতা ম্যানেজার হিসেবে বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি তত্কালীন চট্টগ্রামের সত্তার ব্যাংক ও ইউনাইটেড ব্যাংকের কর্তৃত্বাধীন ইউনিয়ন ব্যাংকের ম্যানেজার ছিলেন। তার এক ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলে ড. মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী নিউজিল্যান্ডে ক্যানটারবুরী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় নিযুক্ত আছেন। বড় মেয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ। ছোট মেয়ে চট্টগ্রামের একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে।

প্রফেসর সাহেব একজন সুখী ও ভাগ্যবান ব্যক্তি ছিলেন। জীবনে ওনার কোনো অপ্রাপ্তি নেই। তবে একটি দীর্ঘশ্বাস তাকে ব্যথিত করেছিল আজীবন। ছোট মেয়ের সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সে তার বিভাগে শিক্ষকতা করতে আগ্রহী ছিল, কিন্তু মেয়ের এই স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় এক নীরব কষ্ট আমৃত্যু লালন করেছিলেন তিনি অন্তরের অন্তস্থলে। একজন গুণি শিক্ষকের মৃত্যুতে শিক্ষাঙ্গনে যে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, এর রেশ থেকে যাবে তার অগণিত শিক্ষার্থী ও গুণগ্রাহীদের মধ্যে। তার ধ্যান-ধারণা, আদর্শ ও সৃষ্টিকর্মের বৈশিষ্ট্য ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হোক যুগে যুগে।

n লেখক :প্রাক্তন অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়