যুক্তরাষ্ট্রের শহরে শহরে বিক্ষোভ, সহিংসতা

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২০, ২২:১৫

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল প্রকাশে দেরি হওয়ায় শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নিউ ইয়র্কসহ কমপক্ষে আটটি রাজ্যে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কায় ১২টি রাজ্যে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি রাজ্যে সন্ধ্যার পর যান চলাচল কমে গেছে। বুধবার সারা দিন এসব রাজ্যের অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। লুটপাটের আশঙ্কায় এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বাইরের অংশ কাঠ ও ধাতব আবরণ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন এগিয়ে জয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকলেও আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। রিপাবলিকান প্রার্থী ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চারটি রাজ্যের ফল প্রকাশের আগেই আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। এমনকি পরোক্ষভাবে তিনি নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন। ট্রাম্প এক টুইটে অভিযোগ করেছেন, ‘বিস্ময়কর ব্যালট’ এসে তার প্রাথমিক এগিয়ে থাকাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার আগে নিয়ম ভেঙে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেকে বিজয়ী দাবি করায় সহিংসতা উনকে দেওয়া হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সতর্ক অবস্থান নেয়। এমনকি ট্রাম্পের এই ঘোষণার মাধ্যমে নির্বাচন-পরবর্তী যে দাঙ্গা-হাঙ্গামার আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা-ই ঘটতে শুরু করেছে বলে মনে করছে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ব্লুমবার্গ নিউজ জানিয়েছে, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা সৃষ্টির আভাস গত ছয় মাস আগে থেকে গোয়েন্দাদের হাতে ছিল। সহিংসতা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন গ্রুপ তৈরির কাজ চলছিল।

স্থানীয় সময় বুধবার রাতে নিউ ইয়র্কের ব্যস্ততম ম্যানহাটনে হাজারো মানুষের নির্বাচনি শোভাযাত্রা সহিংসতায় রূপ নেয়। ‘প্রতিটি ভোট গণনার দাবি’তে আয়োজিত সমাবেশ থেকে পুলিশ অন্তত ২০ জনকে গ্রেফতার করেছে। সন্ধ্যার পর থেকেই ম্যানহাটনে ‘সব ভোট গণনা করা হোক’ ও ‘গণতন্ত্রের জয় হোক’ এমন স্লোগান নিয়ে এই শোভাযাত্রা বের করে হাজারো মার্কিনি। এই শোভাযাত্রা নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীর পক্ষে ছিল না। তবে শোভাযাত্রা থেকে অনেককে নিউ ইয়র্ক পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত ৮টার কিছু আগে ম্যানহাটনের ওয়াশিংটন স্কয়ার পার্ক এলাকার কাছাকাছি ওয়েস্ট ভিলেজে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের একটি পোস্টারে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এরপরই পুরো এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর আরেক দল জনতা ওয়েস্ট ফোর্থ স্ট্রিট ও সিক্সথ অ্যাভিনিউয়ে সড়কের পাশে রাখা আবর্জনার স্তূপে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ সড়ক থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে কয়েক দফা তাদের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গ্রেফতার শুরু করে। রাত ১১টা পর্যন্ত ২০ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। শত শত পুলিশের গাড়ি রাস্তায় লাইট ও সাইরেন বাজিয়ে টহল দেয়। ম্যানহাটনে ভূতুড়ে ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়।

বুধবার রাতে ম্যানহাটনের ফিফথ অ্যাভিনিউ ও ওয়েস্ট এইট স্ট্রিটেও একই ঘটনা ঘটে। নিউ ইয়র্ক পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সমাবেশের প্রতি সম্মান দেখানো হবে। তবে সহিংসতা ও লুটপাটের কোনো লক্ষণ দেখা গেলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে বুধবার সন্ধ্যায় ওয়াশিংটন, অ্যারিজোনা, লস অ্যাঞ্জেলেস,
মিনিয়াপলিস, শিকাগো, মিশিগান, ডেনভার ও পোর্টল্যান্ড শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা সহিংসতার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পোর্টল্যান্ড ও ওরেগনে প্রতিটি ভোট গণনার দাবিতে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল গার্ডের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভ থেকে কিছু মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে সিটি সেন্টারে বিভিন্ন দোকানের জানালা ভাঙচুর করে।

বুধবার ওয়াশিংটনের লাফায়েত স্কয়ারের কাছে ট্রাম্প ও বাইডেনের সমর্থকেরা মুখোমুখি অবস্থা নেন। এ সময় এক নারীসহ তিন জন ছুরিকাহত হন। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ওয়াশিংটনের পুলিশপ্রধান পিটার নিউজহ্যাম এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় কাউকে ছুরি মেরে হত্যার চেষ্টা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

মিনিয়াপলিসে দুই শতাধিক বিক্ষোভকারী রাস্তা দখল করলে সেখান থেকে কয়েক জনকে আটক করেছে পুলিশ। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলো বলছে, বিক্ষোভকারীরা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার ভোট বন্ধের আহ্বানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছিলেন। একই ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে ফিলাডেলফিয়া ও শিকাগোতে।

মিশিগানে ৭৯ হাজার ফেসবুক ব্যবহারকারী ‘স্ট্যান্ডআপ মিশিগান, আনলক মিশিগান’ নামে একটি গ্রুপ খুলে ডেট্রয়েটের টিসিএফ সেন্টারে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে ডেট্রয়েটে ট্রাম্প সমর্থকেরা ভোট গণনা কেন্দ্রের বাইরে জড়ো হয়ে ‘ভোট গণনা বন্ধ করো’ স্লোগান দিতে থাকে। সে সময় বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জানালা ভাঙচুর করে তারা। অ্যারিজোনার ফিনিক্সেও একই ধরনের ছোটখাটো বিক্ষোভ হয়েছে। বুধবার রাতে অ্যারিজোনার মেরিকোপা নির্বাচনকেন্দ্রের সামনে ভোট গণনায় বাধার সৃষ্টি করেন ট্রাম্প সমর্থকেরা। শত শত সমর্থক অ্যারিজোনা স্টেট ক্যাপিটলে জড়ো হয়ে এই বাধার সৃষ্টি করেন।