এক লোক বনে গেছে কাঠ কাটতে। দিনভর বেশ খাটাখাটুনি গেল। অনেক গাছ কাটা হলো। এখন এসব নিয়ে বাজারে যাওয়ার পালা। বিক্রি করলে কিছু টাকাপয়সা আসবে। তা দিয়ে কিনতে হবে সংসারের জিনিসপত্র। গাছ যেগুলো কাটা হয়েছে, তার ডালপালাগুলো বেশ লম্বা লম্বা। ঝোপালোও বটে। কোনো কোনোটাতে আবার ধারালো কাঁটাও আছে। সবগুলো মাথায় করে বয়ে নিতে হচ্ছে। পথচারী কারো গায়ে যাতে ডালপালা না লাগে, সেজন্য লোকটি খুবই সতর্ক। চলতে চলতে সে কারণে হাঁকডাক করতে হচ্ছে। হেই হুঁশিয়ার, সাবধান ভাই। একটু দেখেশুনে পথ চলবেন। এমন সব কথাবার্তা সে জোরেশোরে বলে যাচ্ছে, আর পথ চলছে।
কিছুদূর যাওয়ার পরের ঘটনা। বাজে স্বভাবের এক লোকের সঙ্গে বিশ্রী একটা কাণ্ড ঘটে গেল। লোকটি খুব দেমাগী। আনমনে সে পথ হাঁটছিল। সাবধান বাণী যে তার কানে যায়নি, তা নয়। গেলেও সে বিশেষ পাত্তা দেয়নি। কাঠুরে লোকটির কাছ থেকে সে একটুও সরে যায়নি। বরং তার গা ঘেঁষে চলতে গিয়ে ঘটল বিপত্তি। কাঁটার ঘায়ে তার জামাকাপড় গেল ছিঁড়ে।
এ নিয়ে দুজনে মহাতর্কাতর্কি, ঝগড়াঝাঁটি। পথচারী লোকটি তো মহাখাপ্পা। জামাকাপড় যে ছিঁড়ে গেছে, সেজন্যে দাবি করল ক্ষতিপূরণের টাকা। কথা কাটাকাটি হলো অনেক। কিন্তু সমস্যার কোনো সমাধান হলো না। শেষমেষ দুজনে গেল বিচারকের কাছে। বিচারকের কাছে নালিশ দিল পথচারী লোকটি।
বিচারক মন দিয়ে শুনলেন অভিযোগ। কীভাবে কী ঘটল, তার খুঁটিনাটি জানতে চাইলেন। দুজনের কাছেই। কাঠুরে একদম চুপ। তার মুখ থেকে কোনো কথা বেরুল না। বিচারকের জেরার মুখেও সে নীরব রইল। এমন ভাব করল যেন সে বোবা।
দেমাগী লোকটিকে জিগ্যেস করলেন বিচারক, একটা বোবা মানুষকে তুমি কেন আমার কাছে নিয়ে এলে? আমার কোনো কথারই সে জবাব দিচ্ছে না। সে বোধহয় কানেও শুনতে পায় না। এখন কী করা যায়?
দেমাগী লোকটি বলে, না না, হুজুর। এ আপনি কী বলছেন? এই পাজি লোকটি ভান করছে। সে মোটেও বোবা নয়।
বিচারক তাকে পালটা প্রশ্ন করেন, তুমি কী করে বুঝলে সে বোবা নয়? সেটা কেমন করে জানো?
দেমাগী লোকটি বলে, গাছের ডালপালা মাথায় নিয়ে লোকটি যখন পথ হাঁটছিল, সে তখন জোরে জোরে চেঁচাচ্ছিল।
এইবার বিচারক জানতে চান, আচ্ছা বেশ। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে সে কী বলছিল?
দেমাগী লোক অকপটে উত্তর দেয়, বলছিল যে, সাবধান সাবধান! হুঁশিয়ার। সবাই একটু দেখেশুনে পথ চলবেন ভাইসব।
বিচারক গম্ভীর হয়ে যান এ কথা শুনে। তিনি বুঝতে পারলেন আসলে কী ঘটেছে। তিনি বলেন, হুম। পথ চলতি লোকজনকে সাবধান করছিল সে। তার দিক থেকে সে তো ঠিকই আছে। যত গোলমাল তো তোমার মধ্যে। তুমি তাহলে দূরে সরে গেলে না কেন? একটুখানি দূর দিয়ে চললে তোমার জামা তো ছিঁড়ত না।
কাঠুরে লোকটাকে বেকসুর খালাস দিয়ে দেন বিচারক।
রূপান্তর : হাসান হাফিজ
