কষ্টে আছেন বিদেশফেরত নারী শ্রমিকরা। কাজ না থাকায় কিংবা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় দেশে ফিরতে হয়েছে তাদের। বৈদেশিক জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার তথ্য মতে, প্রবাসী শ্রমিকদের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। প্রতি বছর বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ২২ থেকে ২৩ লাখ মানুষ যুক্ত হচ্ছেন। জমিজমা বিক্রি করে কিংবা ধারদেনা করে একটু সুখের আশায় তারা পাড়ি জমান বিদেশে। সেখানে পদে পদে হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হন। যে কাজের কথা বলে তাদের বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই কাজ দেওয়া হয় না। মজুরি দেওয়া হয় কম। থাকতে হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। অনেকের ওপর করা হয় অমানবিক আচরণ।
জানা যায়, মহামারিতে শ্রমিক ছাঁটাই ও কাজের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এই শ্রমিকরা দেশে ফিরে এসেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী শ্রমিককে তাদের নিয়োগকর্তা দেশে ফিরে আসার সময় পূর্ণ বেতন দেননি। ফলে দেশে ফিরেই তারা অর্থ সংকটে পড়েছেন।
বিএমইটির সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে মোট ৯ লাখ ১৬ হাজার ৪৬৩ জন নারী শ্রমিক বিদেশে অভিবাসন করেছেন। সাম্প্রতিককালে নিগ্রহের শিকার হয়ে তাদের অনেকে দেশে ফিরে এসেছেন এবং গণমাধ্যমে এসব নিগ্রহের চিত্র দেখে সম্ভাব্য অনেক নারী কর্মীই বিদেশ যেতে নিরুত্সাহিত হয়ে পড়েছেন। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৯ সালে নানা রকম নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রায় ৩ হাজার নারীকর্মী দেশে ফিরেছেন। অনেকেই আবার ফিরেছেন লাশ হয়ে। শারীরিক নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে বহু নারীকর্মীকে দেশে ফিরতে দেখা গেছে। অভিবাসী নারী শ্রমিকদের একটা বড় অংশই বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্ত নারী, দেশে রয়েছে যাদের পরিবারের কিছু অসহায় সদস্য। যাদের দরকার জরুরি সহায়তা।
করোনা ভাইরাসের কারণে দেশে ফেরত প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের পক্ষ থেকে করা এক জরিপে জানা যায়, ফিরে আসা শ্রমিকদের ৮৭ শতাংশেরই বর্তমানে আয়ের কোনো উত্স নেই। ৭৪ শতাংশ জানিয়েছেন তারা প্রচন্ড দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও ভীতির মধ্যে রয়েছেন। ৩৪ শতাংশ জানান, তাদের নিজেদের সঞ্চয় বলতে এখন আর কিছু নেই। অনেকে আবার ফ্রি ভিসায় কাজ করতে গিয়েছিলেন। ফলে তাদের কোনো নিয়োগকর্তা নেই। অন্যদিকে লকডাউন থাকার ফলে ভিসা নবায়ন করতে না পেরে খালি হাতে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। যারা ধারদেনা করে বিদেশ গিয়েছিলেন তারা পড়েছেন ভয়াবহ চাপে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে প্রাপ্ত তথ্যে, চলতি বছরের এপ্রিলের ১ তারিখ থেকে অক্টোবরের ৭ তারিখ পর্যন্ত ১৮টি দেশ থেকে ১৮ হাজার ৭৬৩ জন নারী শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছেন। বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্র সৌদি আরব, ওমান, জর্ডান, লেবানন, আরব আমিরাত ও কুয়েতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের নিয়ে বেশ কিছুদিন আগে একটি গবেষণা করে। এই গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে, ৭৬ শতাংশ শ্রমিক যারা মহামারির সময় দেশে ফিরেছেন তারা পুরো বেতন পাননি। গবেষণা সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু) সভাপতি ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, যেহেতু নারী শ্রমিকরা বেশির ভাগই বৈধ পথে বিদেশে গিয়েছেন, সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট এনজিওর সঙ্গে পার্টনারশিপে এই পরিস্থিতিতে যারা ফিরে আসছেন তাদের চিহ্নিত করে মানসিক সহায়তা প্রদান করা। পাওনা বেতন নিয়ে নিয়োগকর্তার সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করতে হবে। তাছাড়া এদের সৃজনশীল কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
