মানসিক সমস্যার কারণে রাজধানীর আদাবরে মাইন্ড এইড হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুল করিম। গতকাল সোমবার সকালে ভর্তির পর কয়েক মিনিটের মধ্যেই মারা যান তিনি। পরিবারের অভিযোগ, ভর্তির পরপর হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছেন। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হাসপাতালের ব্যবস্থাপকসহ পাঁচ জনকে গ্রেফতার করেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করায় তারা পুলিশ কর্মকর্তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন।
আনিসুল করিম ৩১তম বিসিএসে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। সর্বশেষ তিনি বরিশাল মহানগর পুলিশে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। তিনি এক সন্তানের জনক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ৩৩ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন।
আনিসুল করিমের ভাই রেজাউল করিম সাংবাদিকদের বলেন, পারিবারিক ঝামেলার কারণে তার ভাই মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা তাকে নিয়ে আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে যান। কাউন্টারে তারা যখন ভর্তির ফরম পূরণ করছিলেন, তখন কয়েক জন কর্মচারী আনিসুলকে দোতলায় নিয়ে যান। এর কিছুক্ষণ পর তাদের জানানো হয় আনিসুল অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। এরপর তারা তাকে দ্রুত হূদরোগ ইনস্টিটিউটে নিয়ে যান। সেখানে চিকিত্সক তাকে পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় ঐ হাসপাতাল থেকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। সেখানে দেখা যায়, বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটের দিকে পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুল করিমকে টানাহেঁচড়া করে একটি কক্ষে ঢোকানো হয়। তাকে হাসপাতালের পাঁচ জন কর্মচারী মিলে মাটিতে ফেলে চেপে ধরেন। এরপর নীল পোশাক পরা আরো দুজন কর্মচারী তার পা চেপে ধরেন। এ সময় মাথার দিকে থাকা দুজন কর্মচারী হাতের কনুই দিয়ে তাকে আঘাত করছিলেন। হাসপাতালের ব্যবস্থাপক আরিফ মাহমুদ তখন পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
সিসি ক্যামেরার ফুটেজে আরো দেখা গেছে, একটি নীল কাপড়ের টুকরা দিয়ে আনিসুলের হাত পেছনে বাঁধা ছিল। চার মিনিট পর আনিসুলকে যখন উপুড় করা হয়, তখনই তার শরীর নিস্তেজ ছিল। একজন কর্মচারী তখন তার মুখে পানি ছিটান। তাতেও আনিসুল করিম নড়াচড়া করছিলেন না। তখন কর্মচারীরা কক্ষের মেঝে পরিষ্কার করেন। সাত মিনিট পর সাদা অ্যাপ্রোন পরা একজন নারী কক্ষে প্রবেশ করেন। ১১ মিনিটের মাথায় কক্ষের দরজা লাগিয়ে দেওয়া হয়। ১৩ মিনিটের মাথায় তার বুকে পাম্প করেন সাদা অ্যাপ্রোন পরা নারী।
রেজাউল করিম বলেন, তার ভাইয়ের রক্তচাপজনিত সমস্যা ছিল। হূদ?রোগও ছিল। কিন্তু এ দুটির কোনোটিই প্রকট ছিল না। হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পিটুনিতেই তার মৃত্যু হয়েছে।
শেরেবাংলানগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানে আলম মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, হূদ?রোগ ইনস্টিটিউটের খাতায় লেখা রয়েছে ‘ব্রট ডেড’ অর্থাত্ সেখানে নিয়ে আসার আগেই আনিসুলের মৃত্যু হয়েছিল।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার হারুনুর রশীদ ইত্তেফাককে বলেন, হাসপাতালের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ তারা সংগ্রহ করেছেন। এই ঘটনায় মামলা হয়েছে। আমরা হাসপাতালের পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেফতার করেছি। আনিসুলের মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। কী ঘটেছিল, তা জিজ্ঞাসাবাদে জানা যাবে। তবে প্রাথমিকভাবে আমরা জেনেছি, তার মানসিক সমস্যা ছিল, তবে সেটা প্রকট না।
মাইন্ড এইড হাসপাতালের সমন্বয়ক মো. ইমরান খান সাংবাদিকদের বলেন, আনিসুল করিমকে জাতীয় মানসিক ইনস্টিটিউট থেকে তাদের হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। ভর্তির সঙ্গে সঙ্গেই তিনি খুব উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করছিলেন। একে ওকে মারধর করছিলেন। তাকে শান্ত করার জন্য ঐ কক্ষটিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, তাকে মারধর করা হয়েছিল, কেন মারা হলো? এ প্রশ্নের জবাবে ইমরান খান বলেন, তিনি তখন হাসপাতালে ছিলেন না। ময়নাতদন্তেই জানা যাবে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে।
