পুলিশ নির্যাতনে রায়হান নামের যুবকের মৃত্যু ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত এসআই (বরখাস্তকৃত) আকবর হোসেনকে আটকের পর ৭ দিনের রিমান্ডে নিলেও তার গ্রেফতার বা আটক নিয়ে সিলেটে আলোচনা পিছু ছাড়ছেনা। ঘটনার পর থেকে আকবর আলোচনায় রয়েছেন। এখন আবার তার গ্রেফতার নিয়ে নতুন করে বিভ্রান্তিও ছড়িয়েছে। নানা কাহিনী প্রচার হচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মিডিয়ায়। একধরণের ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। তবে সিলেটেবাসী প্রকৃত সত্য জানতে চায়। আকবরকে সাধারণ জনতা আটক করেছে না পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এই প্রশ্ন সর্বত্র। পুলিশ জনতার ক্রেডিট ছিনতাই করছে- এমন অভিযোগও করছেন কেউ কেউ।
তবে সিলেটের পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিন বলছেন, জেলা পুলিশ কারো ক্রেডিট ছিনতাই করেনি। বরং যারা এমন সমালোচনা করছেন তারা পুলিশের অর্জন ও পরিশ্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছেন।
২০ লাখ টাকার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন রহিম
প্রথমে জানা যায়, সীমান্ত এলাকা কানাইঘাট এলাকার আবদুর রহিম নামের এক ব্যবসায়ীসহ আরো কয়েকজন ঐ ভারতের দনা সীমান্তের এলাকা হতে খাসিয়াদের নিকট থেকে আকবরকে নিয়ে আসেন। সীমান্তের ওপারে কুলিয়ান খাসিয়াপুঞ্জিতে আব্দুর রহিম ও তার সহযোগীদের নিকট হস্তান্তরের সময় তাকে ছেড়ে দিতে ২০ লাখ টাকার প্রস্তাব দেন বরখাস্তকৃত এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া। আকবর বার বার বলছিলেন, ২০ লাখ টাকা দেব। আমাকে ছেড়ে দেন ভাই। কিন্তু আকবরের এই প্রস্তাবে রাজি হননি, আব্দুর রহিম ও তার সহযোগীরা। তারা আকবরকে বেঁধে নিয়ে আসেন। আব্দুর রহিম আকবরকে বলেন, তুমি তো দেশের শত্রু। তোমারে বাঁচাইয়া রাখা যাবে না। আব্দুর রহিম নিজ উদ্যোগে আটকের কথা বলেছেন।
কিন্তু স্থানীয়রা বলেছেন ভিন্ন কথা। স্থানীয় শাহাব উদ্দিন ও সালেহ আহমদ জানান, আকবরকে নিয়ে আসার জন্যেই ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে আব্দুর রহিমকে পাঠানো হয়। এজন্যে সে সেখানে গিয়ে মোবাইলেও কথা বলেছে। সে মোবাইলে বলে-‘সালেহ আহমদনি। ওসি স্যারকে বলিও তারে পাইছিলি।’
সূত্র মতে, রায়হান হত্যার পর আকবর পালিয়ে যান সীমান্তের ওপারে । খাসিয়া অঞ্চলে অবস্থান করলেও পরে চলে যান মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে। সেখানে বেশভুষাও পাল্টে কুমার দেব নাম ধারণ করে হোটেলে ছিলেন। পরে চলে আসেন আসামের শিলচরে। এরপর করিমগঞ্জের বদরপুরে। পরে তিনি মেঘালয়ের খাসিয়াপুঞ্জি হয়ে কানাইঘাটের দনা সীমান্তের খাসিয়াপুঞ্জিতে আসেন। একপর্যায়ে বুঝতে পারেন আকবর- তিনি আটকা পড়েছেন। খাসিয়াপুঞ্জির হেডম্যানের নিকট তাকে হস্তান্তর করা হয়। এরপর নানান কৌশল অবলম্বন করে গত সোমবার দুপুরে ওপার থেকে নিয়ে আসা হয় আকবরকে দনা সীমান্তে।
অপর এক সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তারা কৌশলে ফিরিয়ে আনেন আকবরকে। সীমান্তবর্তী দনা ছড়া গ্রামের আব্দুর রহিম বিভিন্ন মাধ্যমকে জানান, তার এক ভাগ্নে শিলচর থেকে আকবরকে ধরে নিয়ে আসেন। এটি তার নিজের ইচ্ছায় করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত কানাইঘাটের ওসিকে জানিয়ে আকবরকে নিয়ে আসেন।
আরো পড়ুনঃ চলতি মাসেই পূরণ হচ্ছে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ৪৮ শূন্য পদ
শাহাব উদ্দিন নামের একজন জানান, সোমবার সকালে কানাইঘাট থানার ওসি শামসুদ্দোহা পিপিএম আমাদেরকে থানায় ডেকে নিয়ে বলেন, ওপারে আকবর তাকে দেশে নিয়ে আসতে সহযোগিতা চাই। এরপর আব্দুর রহিমকে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে ওপারে পাঠানো হয়। তার সাথে আরও ৫ জন ছিলেন। তারা সকলে মিলেই আকবরকে সোমবার ১১ টার দিকে সীমান্তের অভ্যন্তরে নিয়ে আসেন ১৩৩৫ নম্বর পিলারের নিকট । তখন শাহাব ও সালেহ সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
বিষয়টি স্পর্শকাতর। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোন কর্মকর্তাই এ বিষয়ে কোন কথা বলতে চাননি। তবে সিলেটের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, আকবর হয়তো সীমান্ত দিয়ে যেতে চেয়েছিল কিংবা সীমান্ত হয়ে দেশে ফিরতে চেয়েছিল। পুলিশের কিছু বন্ধুর সহযোগিতায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পেরেছে।
অপর সূত্র জানায়, রায়হান নিহতের মামলায় প্রধান আসামি আকবরকে পেতে ভারতীয় আশ্রয়দাতাকে ১২ লাখ টাকা দিতে হয় সিলেট জেলা পুলিশকে। চুক্তি অনুযায়ী উমখিয়াং পুঞ্জির খাসিয়াদের হাতে আকবরকে হস্তান্তর করে আশ্রয়দাতা আসামের শিলচরের কইপত্যপাড়া এলাকার বাসিন্দা গোপাল দাস।
আকবর গ্রেফতারের পর পুলিশের কাছে তার দেয়া তথ্য মতে, ১২ অক্টোবর বিকালে বন্দর ফাঁড়ি থেকে পালিয়ে রাতে শহরেই অবস্থান করে। পরদিন বিকালে স্থানীয় এক সাংবাদিকের সঙ্গে সিলেটের কোম্পানি এলাকার ভোলাগঞ্জ যায় এবং সেখানে রাত্রিযাপন করেন। পরদিন ১৪ অক্টোবর ভোরে ভারতের মাঝাই গ্রামে নরেশ সিংহ নামের এক চুনাপাথর ব্যবসায়ীর বাসায় ওঠে। সেখানে চার রাত অবস্থান করে আকবর।
১০ লাখ রুপীর বিনিময়ে আকবরকে ভারতীয়রা ফেরত দেয়
এদিকে বাংলাদেশের পুলিশ ভারতীয় খাসিয়া ও পান্নার মাধ্যমে নরেশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে নরেশ জানায়, তার কাছে আকবর নেই। নরেশ সিংহ ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যার দিকে আকবরকে মাঝাই গ্রাম থেকে সরিয়ে আসামের শিলচরে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে নরেশের বন্ধু পান্নার আত্মীয় গোপাল দাসের বাড়িতে ওঠে আকবর।
জেলা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, পরে গোপাল নামের একজনের তথ্য পায় জেলা পুলিশ। সেই তথ্য অনুযায়ী জকিগঞ্জ স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানিকারক ভারতীয় এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করে পুলিশ। ঐ ব্যবসায়ীর মাধ্যমেই পুলিশ নিশ্চিত হয় গোপালের বাড়ি শিলচরের কইপত্য পাড়ায়। পরে তার মাধ্যমেই গোপাল দাসের সঙ্গে আকবরকে ফিরিয়ে দেয়ার আলোচনা শুরু হয় এবং মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ফিরিয়ে দিতে রাজি হয় গোপাল। কিন্তু সে ৫০ লাখ টাকা দাবি করলে পুলিশ যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। দু‘দিন পর গোপাল নিজেই ফোন করে বলে ভারতীয় ১০ লাখ রুপীর বিনিময়ে কানাইঘাটের ডোনা সীমান্তে আকবরকে ফেরত দেবে। বাংলাদেশি ১২ লাখ টাকায়।
পরে পুলিশ ভারতীয় এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১০ লাখ রুপি সংগ্রহ করে ডোনা সীমান্তের খাসিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এরপর গোপাল আকবরকে জানায়, শিলচরে তাকে ভারতীয় পুলিশ খুঁজছে। তাই তাকে গোয়াহাটির এক আত্মীয়ের বাসায় নিয়ে যেতে হবে। এই বলে তাকে গাড়িতে করে আনা হয় ৯ নভেম্বর ডোনা সীমান্তে। ঐদিন সকালে খাসিয়ারা পুলিশের দেয়া ১০ লাখ রুপি গোপালের কাছে হস্তান্তর করলে আকবরকে তাদের কাছে দিয়ে দেয়। পরে কথা অনুযায়ী রহিম তার লোকজন নিয়ে সকালেই ডোনা সীমান্তে যায় এবং আকবরকে নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে রহিমসহ স্থানীয় ৫ জন। পরে পুলিশ আকবরকে গ্রেফতার করে।
ইত্তেফাক/এমএএম
