শহুরে সুবিধায় গ্রাম :প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসন্ন

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২০, ২১:৩৭

পুরাতন যুগে সনাতনীদের বিশ্বাস ছিল, বেদে সকল কিছু আছে। এ যুগে বলা হয়, নেটে সকল কিছু আছে। জড়ো হয়ে গ্রামে পুথিপাঠের ইতিহাস বহু পূর্বেই বিলুপ্ত হইয়াছে। সেই পুথিতে যেমন নানান কিছুর সহিত গ্রামীণ জীবনের নানান অসংগতিও থাকিত, তেমনি এই যুগেও নেটে শহর আর গ্রামের সকল তথ্যই দৃশ্যমান। বরঞ্চ রাখঢাক করিবার কিছুই নাই। গ্রামীণ জীবনে এই নেট কিংবা প্রযুক্তির ছোঁয়া যে শুধু শহর আর গ্রামকে অবাধ তথ্যপ্রবাহের সমান করিয়াছে তাহাই নহে, বরঞ্চ অবহেলিত গ্রামকেও আজ শহরে রূপান্তর করিবার পথে সহায়ক হইয়াছে। কোথায় ব্রিজ ভাঙিয়াছে, কিংবা রাস্তা করিতে হইবে—সেই তথ্য এখন মুহূর্তেই নীতিনির্ধারকদের নিকট চলিয়া আসিতেছে। ফলে, সমস্যা সমাধান এখন আর পূর্বের মতন বিলম্বিত হইতেছে না। একইভাবে সামগ্রিক অর্থনীতিতে গ্রামীণ জনগণের যে অবদান রহিয়াছে তাহাও প্রকাশ্য হইয়াছে। শুধু কৃষি খাতই নহে, সঞ্চয়ের টাকায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত যে ফুলিয়া-ফাঁপিয়া উঠিয়াছে তাহাও স্পষ্ট। ইহা সর্বজনস্বীকৃত যে, গ্রামীণ জনগণ অর্থনীতির মূল স্রোতে অবদান রাখিয়া চলিতেছে। গ্রামই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ করের মাধ্যমে সরকারের ব্যয়ভার লাঘবে গ্রামীণ মানুষের অবদানই অধিক। গ্রামীণ মানুষের সঞ্চয়-আমানতের টাকাই শহুরে মুষ্টিমেয় লোকের নিকট চলিয়া যাইতেছে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে। সেই টাকা বিনিয়োগ করিয়া ব্যাংক যেমন ব্যবসা করিতেছে, তেমনি গড়িয়া উঠিতেছে কলকারখানা। সুযোগ হইতেছে কর্মসংস্থানের। বাড়িতেছে উত্পাদন আর আমরা বলিতেছি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বেগবান হইয়াছে। যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে গড়িমসি, খেলাপি হওয়া এবং খেলাপিদের উদ্ধারে নীতিমালা কম হইতেছে না।

এককালের বঞ্চিত সেই গ্রামীণ জনপদ আজ প্রায় সকল সুবিধাই ভোগ করিতেছে। শহরের মতন পরিকাঠামো হইতেছে। ঘরে ঘরে আলো জ্বলিতেছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে গ্রোথ সেন্টার স্থাপন হইতে শুরু করিয়া তথ্যপ্রযুক্তিসেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা হইতেছে। হালের বলদের বদলে কৃষক আজ আধুনিক যান্ত্রিক সুবিধায় হালচাষ করিতেছে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে প্রতি বত্সরই বাড়িতেছে বরাদ্দ। কারণ, গ্রামকে শহর করিতে হইবে—ইহা বর্তমান সরকারের ঘোষিত নীতি। এই নীতির আওতায় উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা তথা রাস্তাঘাট, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও সুচিকিত্সা, সুপেয় পানি, মানসম্মত শিক্ষা, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি, উন্নত পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, কম্পিউটার এবং দ্রুতগতিসম্পন্ন ইন্টারনেটের সুবিধাসহ মানসম্পন্ন ভোগ্যপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হইবে। গ্রামকে এই অগ্রাধিকারে লইয়া আসার কাজটি শুরু করায় সরকারকে ধন্যবাদ জানাইতে হয়। কমবেশি সকলেই জানিত যে, গ্রামের উন্নয়ন ছাড়া সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নহে। তথাপি পূর্বে গ্রামকে বদলাইয়া দেওয়ার কাজটি এতটা অগ্রাধিকার দেওয়া হয় নাই। ১৯৮৪ সালে ২০টি জেলা ভাঙিয়া ৬৪টি জেলা করিবার যে কঠিন সিদ্ধান্ত লওয়া হইয়াছিল, সেই সময় আমাদের বাজেটের আকার আর কতই-বা ছিল। পরবর্তী সময়ে উপজেলা করিবার সিদ্ধান্তও ছিল বৈপ্লবিক। ইহার মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদকে উন্নয়নের মূল স্রোতে লইয়া আসাই ছিল উপজেলা পদ্ধতির অন্তর্নিহিত দর্শন। তাহারই ধারাবাহিকতায় গ্রামমুখী যেই সকল উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ চলিতেছে তাহা সেই দর্শন বাস্তবায়নের সুযোগ করিয়া দিয়াছে।

বর্তমান সময়ে আমরা দেখিতেছি, যেই সকল উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হইয়াছে তাহাতে গ্রামকে শুধু প্রাধান্যই দেওয়া হয় নাই, এমনকি হাওর অঞ্চলের পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা দূরীকরণসহ বাসিন্দাদের ভাগ্য উন্নয়নেও প্রকল্প বাস্তবায়িত হইতেছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাসমূহও মানুষের কর্মসংস্থানমুখী কাজ করিতেছে। এই যে উদ্যম পরিলক্ষিত হইতেছে, তাহার সঠিক বাস্তবায়ন শহরবাসী ও গ্রামবাসীর সুযোগ-সুবিধায় বিদ্যমান হেরফের দূরীভূত করিবে। হয়তো আমাদের ধারণাগত শহর করা যাইবে না; কিন্তু গ্রামের অবয়বেই গ্রামকে শহরে রূপান্তর করিবার উদ্যোগ সফল হইবে। আর তখনই হইবে সামগ্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। কার্যকর হইবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সেই স্লোগান—কাউকে বাদ দিয়া নহে।