হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২০, ২১:৪০

পারভেজ তৌফিক জাহেদী

নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী এ বছর গত ৯ নভেম্বর ঢাকার একটি দায়রা আদালতে সম্ভবত বাংলাদেশে প্রথম রায় হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটা একটি যুগান্তকারী সূচনা। আইনের নাম থেকে অনুমান করে নেওয়া যায় যে, কী বিষয়ে এই আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা ব্যক্তি কর্তৃৃক তাদের হেফাজতে থাকা কোনো ব্যক্তিকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে আহত বা মৃত্যু ঘটানো রোধ কল্পে এই আইনটি পাশ করা হয়েছে। এই যুগোপযোগী আইনটি অনুমোদন তথা প্রণয়ন করার জন্য বাংলাদেশ সরকার অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার। তবে এখানে কিছু বিষয় প্রণিধান যোগ্য যে, আইন শুধু পাশ করলেই হয় না। তার যথাযথ প্রয়োগ ও আইনি সুবিধা নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। পাশাপাশি যে প্রতিষ্ঠানগুলো এ আইনগুলো বাস্তবায়ন বা প্রয়োগ করবেন তাদেরকেও কিছুটা ক্রিয়াশীল, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, সাহসী ও দায়িত্ববোধ নিয়ে সততার সঙ্গে কাজ করতে হবে। কোনো সাধারণ ব্যক্তি যেমন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অর্থাত্ পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, সিআইডি, বিশেষ গোয়েন্দা শাখা ইত্যাদি কর্তৃক কোনো রকম নির্যাতনের শিকার না হয় তার জন্য প্রয়োজনীয় মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

প্রথমত, সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আন্তরিকভাবে নিজ নিজ ডিপার্টমেন্টকে নিয়ন্ত্রণ করবে। তাদের অধীন কোনো সদস্যের যে কোনো প্রকার অসদাচরণ বা অনিয়ম অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিতে হবে। বাহিনীর সম্মান মনে করে তাকে কোনোভাবে প্রটেকশন দেওয়া যাবে না। যদি কোনো সদস্য কোনো অনিয়ম করে থাকে, তাহলে তার দায়িত্ব তার ব্যক্তিগতভাবেই দেখতে হবে। প্রয়োজনে বাহিনীর সত্ ও সিনিয়র অফিসারদের সমন্বয়ে নিয়মিত মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, কোনো কোনো সদস্য খুব অল্প সময়েই বিপুল পরিমাণ বিত্ত বৈভবের মালিক হয়ে যায়। দুদক, গণমাধ্যম বা সাধারণ মানুষ জানার আগে কিন্তু উক্ত বাহিনীই প্রথম বুঝবে তার এই আর্থিক পরিবর্তনের বিষয়টি। হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু বন্ধ করার জন্য বা যে কোনো ধরনের অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রয়োজনে দেশে প্রতিটি পুলিশ স্টেশনের ভেতরে সিসিটিভির ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যা উক্ত বাহিনীরই সত্ ও সিনিয়র অফিসার দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে ।

দ্বিতীয়ত, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু রোধে বিচারক ও আইনজীবীদের একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ এটা মনে করে বিচার শুরু করতে হবে। আমি আগেই বলেছি আদালতে আইনজীবী ও বিচারকগণকে নিয়ম মাফিক কাজের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা প্রোঅ্যাকটিভ (Proactive) হতে হবে। যে কোনো মামলায় যখন কোনো আসামিকে আদালতে প্রেরণ করা হয়, তখন সংশ্লিষ্ট কগনাইজিং ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব সেই আসামিকে সঠিকভাবে বুঝে নিয়ে কারাগারে প্রেরণ বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতারকৃত আসামির শারীরিক অবস্থা অবশ্যই নিজ চোখে দেখে তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথা বলে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে যে, অনেক ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার অধিক সময় থানা হাজতে আটক করে রাখা হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট ফরোয়ার্ডের দুই-তিন দিন পূর্বে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করা হয়। এই দুই-তিন দিনে থানা পুলিশের সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা তাদের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে নানারকম দেনদরবার হয়। শতকরা নব্বই ভাগ হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু এই সময়েই হয়ে থাকে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরও উচিত অভিযুক্ত আসামির সঙ্গে কিছু কথা বলে সত্যতা অনুধাবনের চেষ্টা করা। প্রতিটি মামলার দুইটি ভার্সন থাকে অর্থাত্ বাদী পক্ষের একটি গল্প ও আসামি পক্ষের একটি গল্প। গদ বাঁধাভাবে কাজ না করে আসামির পরিবারের সদস্যের সঙ্গে নিজ চেম্বারে কথা বলে প্রকৃত ঘটনা উপলব্ধির চেষ্টা করা। যদি কোনো রকম অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়, তাহলে তা লিখিতভাবে উক্ত আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা উক্ত আইনজীবীর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। রিমান্ড দরখাস্ত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

ইদানিং দেখা যাচ্ছে যে, প্রায় সব ফৌজদারি মামলায় আইনগতভাবে প্রয়োজন না থাকলেও তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ ঢালাওভাবে বিশেষ উদ্দেশ নিয়ে রিমান্ডের আবেদন করে। পুলিশি রিমান্ডের আদৌও কোনো আইনগত বা যৌক্তিক প্রয়োজন রয়েছে কি না তা বিবেচনায় নিয়ে রিমান্ড দরখাস্ত নিষ্পত্তি করা আদালতের দায়িত্ব ও কর্তব্য। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, ফৌজদারি মামলার তদন্ত কার্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তা শেষ করে না। অনেক আইনেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত কার্য শেষ করার কথা সুনির্দিষ্ট বলা হয়েছে। এই বিষয়গুলো আইনজীবীগণকে খেয়াল করে সুনির্দিষ্টভাবে বিচারকের নজরে নিয়ে এসে তদন্ত রিপোর্টি দাখিলের জন্য তাগিদ দিতে হবে। আদালতে বিচারক ও আইনজীবীবৃন্দ যৌথভাবে ইনোভেটিভ প্রক্রিয়ায় কাজ করলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর এক ধরনের চেক অ্যান্ড ব্যালান্স অবস্থা তৈরি করা যায়। এই সমস্ত প্রক্রিয়াগুলো অনুসরণ করলে হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু অনেকাংশে কমানো যায় । তৃতীয়ত, নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ বাস্তবায়নে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে। গণমাধ্যম নিয়ে অনেকে অনেক রকম নেতিবাচক কথা বললেও যে কোনো রকম আইনি অধিকার, অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি রোধে সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমের গুরুত্ব অপরিসীম। হাজার রকম নির্যাতন, হুমকি, মামলা উপেক্ষা করেই গণমাধ্যম কাজ করে যাচ্ছে। গণমাধ্যম কোনো বিষয়ের অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রচার করলেই তখন দেখা যায় সরকার বা দুদক উক্ত বিষয় নিয়ে একটু নড়েচড়ে বসে।

পরিশেষে বলা যায় যে, নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ বাস্তবায়নে উপরোক্ত তিনটি বিষয়ের যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমেই সম্ভব। একটি সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে আইনের শাসন কায়েম বা বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই।

n লেখক : আইনজীবী, সাধারণ সম্পাদক,

রাজশাহী অ্যাডভোকেট বার অ্যাসোসিয়েশন