অভিনয়টাই বেঁচে থাকা

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২০, ২১:৫৮

 “প্রায় ছয় দশক ধরে অভিনয় করছি। এই যাত্রাপথ কঠিন ছিল। আমি ‘অপুর সংসার’ এই একটি ছবি করেই যাকে বলে ‘টক অব দ্য টাউন’ হয়ে উঠেছিলাম। তার পরও পরের যাত্রা খুব সহজ ছিল না। এই কঠিন পথ পাড়ি দিতে অনেক কিছু ছাড়তে হয়, অনেক কিছু দিতে হয়। একজন অভিনেতাকে চার অক্ষরের একটি শব্দকে আঁকড়ে রাখতে হয়, তা হলো ভালোবাসা। ভালোবাসা ছাড়া কিছু হয় না।” বলেছিলেন দুই বাংলার অভিনয় জগতের কিংবদন্তিতুল্য পুরুষ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

পাঁচ বছর আগে ঢাকায় গঙ্গা-যমুনা নাট্য ও সাংস্কৃতিক উত্সবে যোগ দিতে এসে সাংবাদিক ও নাট্যকর্মীদের সঙ্গে আড্ডায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন ‘অপু’, ‘ফেলুদা’ ‘তিন ভুবনের পারে’র সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। কয়েক ঘণ্টার সেই আড্ডায় মধ্যমণি হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তার সেসব কথা অভিনয়শিল্পীদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। কথার নৈপুণ্যে, বলার মুন্সীয়ানায় সবাইকে যেমন আনন্দ দিয়েছিলেন, তেমনি সারাজীবনের রসদও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন দীর্ঘ অভিনয় জীবনের অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে। দুই বাংলার অভিনয় জগতের কিংবদন্তিতুল্য শিল্পী  সেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় চলে গেছেন না ফেরার দেশে। সেদিন সৌমিত্রের দীর্ঘ আড্ডার খানিক অংশ তুলে ধরার হলো ইত্তেফাক পাঠকদের জন্য।

বাংলাদেশের দর্শকদের উদ্দেশে সৌমিত্র বলেছিলেন, ‘আপনাদের প্রাণভরে ধন্যবাদ জানাই। এটা আপনারা আমাকে ভালোবাসেন সেজন্য নয়, আপনারা আমার কাজের প্রতি এখনো আগ্রহ ধরে রেখেছেন সেজন্য। এখানে এসে মনটা ভালো হয়ে যাচ্ছে। আপনাদের আগ্রহ—বোধহয় এটার লোভেই আমরা অভিনেতারা টিকে থাকি, বসে পড়ি না। আমার যা বয়স বসে যাওয়ারই কথা। কিন্তু বিশ্রাম নিতে চাই না। আমার জীবনে অভিনয় করার বিকল্প নেই। অভিনয়টাই বেঁচে থাকা।’

অভিনয়ের মূলমন্ত্র প্রসঙ্গে সৌমিত্র বলেন, ‘অভিনয়ের কোনো স্বরলিপি নেই। মুদ্রা নেই। সেই মূহূর্তে কোনটা প্রয়োজন সেটা অভিনেতাকে ঠিক করতে হয়। অভিনয় করতে করতে শিখতে হয়। প্রস্তুতি নিতে নিতে তা মেলে। পঞ্চান্ন বছর পরে এখন কখনো কখনো মনে হয়, এখন হয়তো কিছু ঠিক ঠিক অভিনয় করছি।’

জনপ্রিয়তার তুঙ্গ স্পর্শ করা এ অভিনেতা কখনোই নিজের স্টার ইমেজ প্রতিষ্ঠিত করতে চাননি। জানিয়েছিলেন, ‘আমার চেহারা নিয়ে হীনমন্যতা ছিল।’ কিংবদন্তিতুল্য অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এ কথা বলার সঙ্গেই সঙ্গেই সবার মধ্যেই হাসির রোল উঠেছিল। সবার হাসি দেখে তিনি আবারও যোগ করেছিলেন, ‘একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা এমন কথা বললে তো হাসারই কথা। কিন্তু এতটা পথ পেরিয়ে এসে যখন জীবন নিয়ে চিন্তা করেছি তখন এই উপলব্ধিটা হয়েছে। আমি রুগ্ণ ছিলাম, ৬৩ দিন জ্বরে ভুগেছি। ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছিল। সেসময় সবাই আমাকে উপহাস করত। দেখলাম অভিনয়টা মুখ লুকানোর একটা জায়গা। চরিত্রের আড়াল নিয়ে প্রকাশিত হওয়ার পন্থা।’

তাহলে নিজেকে মুক্ত অবস্থায় খুঁজে পান কোথায়—এমন প্রশ্নের জবাবে সৌমিত্রর উক্তি ছিল, ‘কবিতায়। সেখানে নিজেকে মেলে ধরার আলাদা সুযোগ এলো। বলতে লজ্জা লাগছে, এই কবিতা লেখার পেছনে বিশেষ কোনো মেয়েকে ভালোলাগার ব্যাপার আছে। আমাদের সময়ে একটি মেয়ের হাত ধরতে অনেক সময় লাগত। সে অব্যক্ত বাসনা থেকেই কবিতা লেখা শুরু। আমি নিজেকে খুঁজে পেতে শুরু করি। অভিনয় হচ্ছে, পারফরমিং আর্ট। কবিতা, গান, মঞ্চ, ছবি আঁকা, চলচ্চিত্র— এসবের মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে।’ যাকে উদ্দেশ করে কবিতা লেখা শুরু তাকে যাপিতজীবনে পেয়েছিলেন কিনা—এমন প্রশ্নের উত্তরে তার সোজা উত্তর ‘হ্যাঁ, পেয়েছি।’ এরপর তার সেই ভুবন ভোলানো হাসিটি হেসেছিলেন সৌমিত্র।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে সৌমিত্র বলেছিলেন, ‘একটা জাতিকে অনেক মূল্য দিয়ে মানুষের মুক্তি আনতে হয়েছে। ত্যাগ কখনো বিফলে যায় না। এখানে নতুন চিন্তার উদ্ভব হবে বলে আমরা আশা করি।’ বাংলাদেশের নাটকের ভবিষ্যত্ প্রসঙ্গেও সে কথাই বলেছিলেন, ‘অভিজ্ঞতা ও ত্যাগ কখনো বিফলে যায় না; যায়নি অতীতে, ভবিষ্যতেও যাবে না হয়তো। সেই সঙ্গে সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের জীবনের সঙ্গে মিল রেখে কতটুকু প্রাসঙ্গিক আমাদের নাটক সেটার ওপরও অনেকাংশে নির্ভর করে।’

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মানেই সত্যজিত্ রায় প্রসঙ্গ আসবেই। সে প্রসঙ্গও এসেছিল। ‘সত্যজিতের কাজের প্রতি আমার বিপুল শ্রদ্ধা ছিল। আমি সবসময় তার কাছে হাঁটু গেঁড়ে শিক্ষার্থী হতে পারতাম। সত্যজিত্ রায় ও আমার প্রতিভার বিপুল পার্থক্য থাকার পরেও আমাদের মাঝে কালচারাল লিগেসি ছিল। সে জন্য হয়তো তিনি আমার সঙ্গে কাজ করে সুবিধা পেতেন, আমি তো পেতামই। আমাদের সম্পর্ক খুব গভীর ছিল। অনেক চরিত্র আমি করতে চেয়েছি কিন্তু তিনি আমাকে নেননি। কিন্তু সব চিত্রনাট্যই তিনি আমাকে শোনাতেন। আমরা আলোচনা করতাম।’

আবৃত্তিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছেই তার ‘ঋষিঋণ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন সৌমিত্র। বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠ নিয়ে আমার পরিবারের মানুষরাও নানা কথা বলত। যেহেতু তার কণ্ঠে আবৃত্তির রেকর্ডিংগুলো বেশ খারাপ মানের ছিল। তবে দেশের বাইরে যে দুই-একটা রেকর্ডিং আছে, তা শুনেই বুঝেছি তার কণ্ঠে কী গভীরতা ছিল।’