বাংলা অভিনয়জগতের কিংবদন্তি চলে গেলেন। বেলা শেষে থেমে গেল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পথচলা। তার অপুর সংসারের ‘অপু’, ‘ফেলুদা’সহ অমর সব চরিত্র বাঙালির হূদয়ে চিরকালের ছাপ রেখে গেছে। তিনি নেই তা বিশ্বাস হতে চাইছে না। সেই ২১ বছর বয়স থেকে রুপালি পর্দায় যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, ৮৬ বছর বয়সে এসেও তা সমান গতিতেই এগিয়ে চলছিল। কিন্তু করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর শ্বাসনালিতে অস্ত্রোপচারের ধকল যেন আর নিতে পারল না তার দেহ। কয়েকটি দিন জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কাটিয়ে অবশেষে মৃত্যুপথে যাত্রা করলেন। বাংলা ছবি হারাল ছয় দশক ধরে রুপালি পর্দায় বিরাজ করা এক মহাতারকাকে।
গতকাল রবিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার বেলভিউ নার্সিং হোমে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সৌমিত্র। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মহানায়ক উত্তম কুমারের সমসাময়িক যুগেও বাঙালির মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছিলেন এই শক্তিমান অভিনেতা। তিনি সব সময় বলতেন, ‘বাংলা ভাষা না থাকলে আমি সৌমিত্র থাকতাম না।’ ৬১ বছর দীর্ঘ চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে প্রায় ২৫০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। পাশাপাশি তিনি পেশাদার মঞ্চে অভিনয় করেছেন। কবি, আবৃত্তিকার, নাট্য নির্দেশক এবং চিত্রশিল্পী হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশের সঙ্গেও সৌমিত্রের ছিল গভীর সম্পর্ক। শুধু সত্যজিত্ রায় নন, তপন সিনহা, মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার থেকে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়-নন্দিতা রায়, সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের মতো আজকের প্রজন্মের পরিচালকদের ছবিতেও অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।
সত্যজিত্ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের চিত্রনায়িকা ববিতার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। এছাড়া বাংলাদেশের সোহেল আরমানের ‘তিন পুরুষ’ নাটকসহ বেশ কিছু নাটকেও অভিনয় করেছেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। পাশাপাশি মঞ্চকর্মী, নাট্যকারদের সঙ্গে তার ছিল গভীর সখ্য। তাকে নিয়ে প্রথম প্রামাণ্যচিত্রটিও নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশে। নির্মাতা মাসুদ করিম, নাম ‘কৃষ্ণকলি’।
করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত সেপ্টেম্বরে বেলভিউ নার্সিং হোমে ভর্তি হন সৌমিত্র। এর আগে তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সেই রোগের ধাক্কা তার শরীরকে দুর্বল করে তুলেছিল। ফলে করোনার আঘাত আর সামলাতে পারেনি তার ৮৬ বছরের দেহ। শ্বাসনালিতে অস্ত্রোপচার, প্লাজমা থেরাপি কোনো কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। টানা ৪১ দিনের লড়াই শেষে জীবন-মৃত্যুর দোলাচলে দুলে মৃত্যুর কোলেই ঢলে পড়লেন তিনি। গত শুক্রবার সৌমিত্রের শারীরিক অবস্থার আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটে। হূদ্যন্ত্র আর কিডনির জটিলতা যায় বেড়ে। সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। চিকিত্সকেরা জানিয়ে দেন, অলৌকিক কিছু না ঘটলে সৌমিত্রের সুস্থ হয়ে ওঠা অসম্ভব। তার পরই দুশ্চিন্তার ছায়া নেমে আসে ভক্তদের মনে।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শোক জানিয়ে তার টুইটার পেজে বাংলায় টুইট করেছেন। শোক জানিয়ে বাণী দিয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে পৌলমী চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘আমরা সবার কাছে ঋণী। বাবাকে ভালেবেসেছেন সবাই। বাবা চিরকাল আমাদের মনে রয়ে যাবেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ আমরা। এত যত্ন করে, ভালোবেসে, সম্মানের সঙ্গে বাবাকে আগলে রেখেছিলেন সবাই।’
আমাদের কলকাতা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, হাসপাতাল থেকে সৌমিত্রের দেহ প্রথমে নেওয়া হয় তার গলফগ্রিনের বাড়িতে। সেখান থেকে টেকনিশিয়ান স্টুডিও হয়ে রবীন্দ্র সদনে নেওয়া হয় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। পরে কেওড়াতলার শ্মশানে দাহ করা হয় তার দেহ। তার শবযাত্রা ভরে উঠেছিল মোমের আলোয়। তাকে শেষ বিদায় জানাতে সব বয়সের মানুষ নেমে এসেছিল পথে। তাদের চোখের জলে ছিল এই মহাতারকার প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা। গান স্যালুটের মাধ্যমে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অন্তিম বিদায় জানানো হয় এই কিংবদন্তি অভিনেতাকে।
সংক্ষিপ্ত জীবনী :সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৫-এর ১৯ জানুয়ারি, পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায়। বাবা মোহিত কুমার চট্টোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী। ১৯৬০ সালে সৌমিত্র বিয়ে করেন দীপা চট্টোপাধ্যায়কে। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ে পৌলমী চট্টোপাধ্যায় নাটকের দলের সঙ্গে যুক্ত। জীবনের প্রথম ১০ বছর সৌমিত্রের জীবন কেটেছে কৃষ্ণনগরে। তাদের বাড়িতে নাট্যচর্চা হতো। দাদার নাটকের দল ছিল। ছোটবেলা থেকেই নাটকে অভিনয় শুরু করেন তিনি। কলকাতার সিটি কলেজে পড়াশোনা শেষ করে সৌমিত্র ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেন। শিশির ভাদুড়ীকে নিজের গুরু মানতেন সৌমিত্র। সিনেমাজগতে পা দেওয়ার আগেই ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। পরিচয় করিয়ে দেন খোদ সত্যজিত্ রায়। তখনই তিনি জানান, তার ছবি ‘অপুর সংসার’-এ অপু চরিত্রটি করবেন সৌমিত্র। সেই ছবির সৌমিত্র-শর্মিলা জুটি আজও বাঙালির কাছে রোমান্টিকতার অনন্য উপমা হয়ে আছে। এরপর একে একে ‘চারুলতা’, ‘ঝিন্দের বন্দী’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘দেবী’, ‘কিনু গোয়ালার গলি’সহ বহু ছবি করেছেন তিনি।
সত্যজিতের প্রায় ১৪টি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র। সত্যজিতের সৃষ্টি ‘ফেলুদা’কে বড় পর্দায় সৌমিত্র প্রথম জীবন্ত করে তুলেছিলেন। বাঙালি দর্শকের কাছে আজও সৌমিত্রই ফেলুদার জীবন্ত রূপ। আর কেউ নয়। তার উল্লেখযোগ্য অন্যান্য ছবির মধ্যে রয়েছে ‘তিন ভুবনের পারে’, ‘বেলা শেষে’, ‘ময়ুরাক্ষী’, ‘অশনি সংকেত’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘দেবদাস’, ‘নৌকাডুবি’, ‘গণদেবতা’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘আতঙ্ক’, ‘গণশত্রু’, ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘তিন কন্যা’, ‘আগুন’, ‘শাস্তি’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ প্রভৃতি। অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন সৌমিত্র। ২০০৪ সালে তাকে পদ্মভূষণে সম্মানিত করা হয়। এছাড়া জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, দাদাসাহেব ফালকেসহ বহু পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
