বহুল আলোচিত ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নতুন আমির নির্বাচিত হয়েছেন আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী। সংগঠনটির মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছেন ঢাকার জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও হেফাজতের ঢাকা মহানগরের আমির মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী। গতকাল চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় আয়োজিত কেন্দ্রীয় সম্মেলনে সারা দেশ থেকে আসা কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে আমির ও মহাসচিব নির্বাচিত হন। ঘোষণা করা হয়েছে ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট নতুন কমিটি।
হেফাজতে ইসলামের পুনর্নির্বাচিত সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী জানান, ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে আমির ও মহাসচিব ছাড়াও নায়েবে আমির পদে ৩২ জন, যুগ্ম-মহাসচিব পদে চার জন, সহকারী মহাসচিব পদে ১৮ জন এবং সম্পাদকমণ্ডলীর বিভিন্ন পদে রয়েছেন ৮১ জন। এছাড়া উপদেষ্টামণ্ডলীতে আছেন ২৫ জন। দেশের আট বিভাগের বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসার প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে এই নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়েছে। এই কমিটিতে হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির মরহুম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর সন্তান আনাস মাদানীসহ তার অনুসারীদের ছাঁটাই করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এ সংগঠনটি ভাঙনের মুখে পড়তে যাচ্ছে।
গতকাল বিকালে ঢাকার দোলাইরপাড়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আনাস মাদানীসহ তার গ্রুপের নেতারা হেফাজতের নবনির্বাচিত কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা বলেছেন, খুব শিগিগরই মূলধারার হেফাজতে ইসলামের ঘোষণা আসবে। হেফাজতের বাদপড়া কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মঈনুদ্দিন রুহী, মুফতি ফয়জুল্লাহ, মুফতি মোহাম্মদ ওয়াক্কাস, প্রচার সম্পাদক আনাস মাদনী প্রমুখ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
সংগঠনটিতে সম্ভাব্য ভাঙন বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, হেফাজতের কোনো অঙ্গসংগঠন নেই। যে কোনো কর্মসূচি হেফাজত কেন্দ্রীয়ভাবে ঘোষণা করবে। এর বাইরে সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে কেউ কর্মসূচি পালন করলে সেটি সম্পূর্ণ অবৈধ।
কমিটি থেকে আহমদ শফীর অনুসারীদের বাদ দেওয়া প্রসঙ্গে আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, কমিটিতে না রাখার বিষয়টি তো এমনি এমনি হয়নি। নিশ্চয় কোনো কারণ আছে। উনারা না রাখার পরিবেশ তৈরি করেছেন বলেই বাদ পড়েছেন।
নতুন কমিটিতে যারা আছেন :আমাদের চট্টগ্রাম অফিস ও হাটহাজারী সংবাদদাতা আতাউর রহমান মিয়া জানান, গতকাল হাটহাজারী মাদ্রাসা মিলনায়তনে সম্মেলনে আল্লামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে ১২ সদস্যের সাব-কমিটি হেফাজতের নতুন এই কমিটির প্রস্তাব দেন। দ্বিতীয় অধিবেশনে নতুন আমির ও মহাসচিবের নাম ঘোষণা করা হয়। সম্মেলনের সভাপতি মহিবুল্লাহ বাবুনগরীর পক্ষে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক এ ঘোষণা দেন। সারা দেশের বিভিন্ন জেলার ৩৭০ জন কাউন্সিলর এতে ভোট প্রদান করেন। প্রধান উপদেষ্টা আল্লামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী, আল্লামা আব্দুস সালাম চাটগামী, আল্লামা আব্দুল হালিম বোখারী, আল্লামা সুলতান যওক নদভী। আমির :আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী সাহেব। নায়েবে আমির :মাওলানা নূরুল ইসলাম জিহাদি, হাফেজ মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জী, মাওলানা নূরুল ইসলাম ওলিপুরী, মাওলানা সালাউদ্দিন নানুপুরী, মুফতি আহমদ উল্লাহ, মাওলানা শেখ আহমদ, মাওলানা আব্দুল হামিদ, মাওলানা আরশাদ রহমানী। মহাসচিব :আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী, যুগ্ম মহাসচিব :মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, মাওলানা মামুনুল হক, মাওলানা লোকমান হাকিম, মাওলানা নাসির উদ্দিন মুনির। সহকারী মহাসচিব :মাওলানা ফজলুল করীম কাসেমী, মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন খুলনা, মাওলানা খুরশিদ আলম কাসেমী, মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, মাওলানা আব্দুল বাসেত খান, মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী, মাওলানা মাহমুদুল হাসান ফাতেহপুরী, মাওলানা মুফতি আজহারুল ইসলাম, মুফতি রহিমুল্লাহ কাসেমী, মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজি, মাওলানা মূসা বিন ইজহার, মাওলানা জাফর আহমদ ভাটুয়া, মাওলানা হাবিবুল্লাহ আজাদী, মাওলানা শফিক উদ্দিন, মাওলানা জসিমুদ্দিন লালবাগ, মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমাদ, মাওলানা হাসান জামিল। সাংগঠনিক সম্পাদক :মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। সহকারী সাংগঠনিক সম্পাদক :মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী, মাওলানা মাসউদুল করীম টঙ্গী, মাওলানা মীর মুহাম্মদ ইদ্রিস, মাওলানা শামসুল ইসলাম জিলানী, মুফতি ওমর ফারুক, মাওলানা আতাউল্লাহ আমেনী ঢাকা, মাওলানা তাফহিমুল হক হবিগঞ্জ, মাহমুদুল আলম রংপুর। অর্থ সম্পাদক :মুফতি মুনির হোসাইন কাসেমী, সহকারী অর্থ সম্পাদক :মাওলানা হাফেজ মুহাম্মদ ফয়সাল, মাওলানা লোকমান মাজহারী, মাওলানা মুহাম্মদ আহসান উল্লাহ, মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস হামেদী। প্রচার সম্পাদক :মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়জী, সহকারী প্রচার সম্পাদক :মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াকুব ওসমানী, মাওলানা ফয়সাল আহমদ মোহাম্মদপুর ঢাকা, মুফতি শরীফুল্লাহ, মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান নারায়ণগঞ্জ, হাফেজ সায়েম উল্লাহ। এছাড়া অন্যান্য পদের নামও ঘোষণা করা হয়।
‘আমি এ পদ গ্রহণ করতে চাইনি :বাবুনগরী
নবনির্বাচিত আমির জুনায়েদ বাবুনগরী তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমি এ পদ গ্রহণ করতে চাইনি। আমি নেতাকর্মীদের বারণ করেছি আমির নির্বাচিত না করার জন্য। কিন্তু তবু তারা আমাকে আমির নির্বাচিত করেছেন। মুরুব্বিরা জোর করে এ দায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন। যেন এ দায়িত্ব পালন করতে পারি।’ হেফাজতের আমির পদের জন্য তাকে বিবেচনা না করতেও তিনি মুরুব্বিদের অনুরোধ করেছিলেন বলে জানান বাবুনগরী।
‘হেফাজত ইসলাম মূর্তিবিরোধী সংগঠন’
ভাস্কর্যের নামে মূর্তিবিরোধী সংগঠন হিসেবে কাজ করে মসজিদের নগরী ঢাকাকে রক্ষার সংগঠন হিসেবে হেফাজতে ইসলাম কাজ করবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল্লামা মামুনুল হক। হেফাজতে ইসলামের সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এসব কথা বলেন মামুনুল হক। মামুনুল হক বলেন, হেফাজতে ইসলাম যেমনি সরকার বিরোধী সংগঠন নয়, তেমনি সরকার দলীয় সংগঠনও নয়। হেফাজতে ইসলাম হলো ভাস্কর্যের নামে মূর্তিবিরোধী সংগঠন।
‘এই কমিটি আমরা মানি না’ :আনাস মাদানী গ্রুপ
গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর দক্ষিণ দোলাইরপাড় বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন আসকান টাওয়ারে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সংগঠনটির সদ্য বিলুপ্ত কমিটির নায়েবে আমির ও ঢাকা মহানগর হেফাজতের প্রধান উপদেষ্টা জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের আমির মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস বলেন, আল্লামা শফীর অবর্তমানে এখন একজন আমির নিযুক্ত করাই ছিল প্রধান কাজ। কিন্তু তা না করে পুরো কমিটি বিলুপ্ত করা হলো। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি বিশেষ মহলের ইন্ধনে এটি করা হয়েছে। ঘোষিত এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে বাদপড়া যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মঈনুদ্দীন রুহী বলেন, ‘এই সম্মেলন অগণতান্ত্রিক ও অবৈধ। এজন্য আমরা কমিটি প্রত্যাখ্যান করছি। খুব শিগিগরই আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে নিজেদের কর্মপদ্ধতি জানানো হবে।’

