মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ
স্থূলতায় বাড়ছে শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি। মুটিয়ে যাওয়া শিশু হাই ব্লাডপ্রেসার, ডায়াবেটিস, হূদরোগ, বিষণ্নতা, জয়েন্টে ব্যথাসহ নানা অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। স্থূলতা এখন কেবল উন্নত বিশ্বের সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের জন্যও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এভাবে শিশুরা যদি অতিরিক্ত ওজন নিয়ে বড় হতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম মারাত্মক হুমকিতে পড়বে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, ১৯৭৫ সালের পর বিশ্বজুড়ে স্থূলতা বেড়েছে তিনগুণ। অতিরিক্ত ওজনের মূল কারণ- ক্যালরি গ্রহণ ও ক্যালরি ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা। সেই সাথে অধিক চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া, কায়িক শ্রমে অনীহা এবং বংশগত কারণও স্থূলতার জন্য দায়ী। ৫ বছরের কম বয়সী স্থূল শিশুর অর্ধেকেরই বাস এশিয়ায়। অতিরিক্ত স্থূলতায় বাড়ে হূদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি ও লিভার রোগ, এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকি। স্থূলতা এক সময় উন্নত বিশ্বের সমস্যা মনে করা হলেও এশিয়া-আফ্রিকার অনেক দরিদ্র দেশেও বাড়ছে এ সমস্যা।
স্থূলতার কারণ হিসেবে চিকিত্সকরা বলছেন, শিশুদের খাবারে জাংক ফুডের আধিক্য, কায়িক পরিশ্রম না করা, হাঁটা-চলা সীমিত থাকা, খেলাধুলার পরিবেশ না থাকা, ভিডিও গেমস, কম্পিউটার ও টেলিভিশনে আসক্তি শিশুদের অতিরিক্ত ওজনের জন্য দায়ী। একইসঙ্গে শিশুদের স্থূলস্বাস্থ্যের জন্য বাবা-মায়ের অসচেতনতাকে দায়ী করেছেন তারা।
‘বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে স্থূলতার প্রকোপ, খাদ্যাভাস ও শারীরিক সক্রিয়তার ধরন’ শীর্ষক এক জরিপ পরিচালনা করেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআরবি)। এতে বলা হয়েছে, শহরাঞ্চলে ১০ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজনে ভুগছে, ৪ শতাংশ শিশু ভুগছে স্থূলতায়। আর ঢাকা মহানগরে অতিরিক্ত ওজন ১৪ শতাংশ শিশুর এবং ৭ শতাংশ শিশু স্থূল। অতিরিক্ত ওজনের শিশুদের ৭০ শতাংশের বয়স ৫ থেকে ১২ বছর। বাকি ৩০ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছর। অতিরিক্ত ওজন ও স্থূল শিশুর সংখ্যা শিক্ষিত পরিবারে বেশি বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের করা এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকার প্রায় ১১ শতাংশ শিশু স্থূলকায় আর অতিরিক্ত ওজন ১৩ শতাংশের। আর এসব শিশু ৪০ বছর পার হওয়ার পরই হূদরোগ ও কিডনির সমস্যাসহ নানা রোগে ভুগবে বলে এতে উল্লেখ করা হয়। গত চার দশকে সারা বিশ্বের শিশু-কিশোরদের মধ্যে স্থূলতার হার বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ। যুক্তরাজ্যভিত্তিক জনস্বাস্থ্য ও চিকিত্সা বিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেটের সামপ্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ল্যানসেট বলছে, বর্তমান বিশ্বের প্রায় সাড়ে ১২ কোটি শিশু-কিশোর স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি অতিরিক্ত ওজনে ভুগছে। আর এর ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশেও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থূলতা থেকে সৃষ্ট রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও নিয়মিত ব্যয়াম হতে পারে যার মূল হাতিয়ার। তবে ছাড়তে হবে চর্বি জাতীয় খাবার ও অতিরিক্ত চিনি। খেতে হতে পুষ্টিকর শাক-সবজি ও ফল-মূল।
প্রিভেনটেবল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী শিশুর বেশি ওজনকে আমরা স্থূলতা বলছি। এর প্রধান কারণ, তাদের খেলার জায়গা কমে যাচ্ছে। টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ভিডিও গেমস নিয়ে শিশুরা এত সময় বসে থাকছে যে তারা যা খাচ্ছে সেই ক্যালোরি খরচ হচ্ছে না। ফলে চর্বি জমে তারা মোটা হয়ে যাচ্ছে। একারণে সারা বিশ্বেই শিশুদের জন্যে গেমস বা মোবাইলে ১ ঘণ্টার বেশি সময় দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, পরিবারগুলোতে এখন সন্তান সংখ্যা এক থেকে দুটি হওয়ায় বাবা-মায়েরা সন্তানের সামনে প্রয়োজনের বেশি খাবার তুলে ধরছে। ফলে শিশুর শরীরে অতিরিক্ত পুষ্টি চলে যাচ্ছে। এই অতিরিক্ত পুষ্টির জন্য শিশু মোটা হতে থাকে। তিনি বলেন, শিশুদের স্থূলতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার জায়গা তৈরি করতে হবে। স্কুলে খেলার মাঠ থাকতে হবে, শিশুদের পড়ার নামে অতি শিক্ষাদানের যে প্রবণতা সেখান থেকে বেরিয়ে এসে গ্রহণযোগ্য আনন্দদায়ক শিক্ষা দান করতে হবে।
