দেশের সিংহভাগ মানুষ মফস্সলে বসবাস করেন, অথচ একবিংশ শতাব্দীতে আসিয়াও বহু ক্ষেত্রেই তাহারা ন্যূনতম চিকিত্সাসেবা পাইতেছেন না। যদিও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়িয়া তোলা হইয়াছে। নিয়োগ দেওয়া হইতেছে নূতন নূতন চিকিত্সকও। চিকিত্সকরা তৃণমূল স্তরে না থাকিলে তাহাদের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারিও একাধিকবার উচ্চারণ করিয়াছেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। কিন্তু বিদ্যমান বিবর্ণ চিত্র উজ্জ্বল হইতেছে না কিছুতেই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের গাফিলতি ও কর্মকর্তাদের যথাযথ নজরদারির অভাবে দেশের অনেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সা-সরঞ্জাম কোনো কাজে লাগিতেছে না। বহু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্সরে মেশিন, অপারেশন থিয়েটার, সার্জারি মেশিনগুলি নষ্ট হইয়াছে অবহেলায় পড়িয়া থাকিয়া। এই সকল বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছি, কিন্তু এখনো যেন বহু ক্ষেত্রেই অবহেলাজনিত সমস্যা জগদ্দল পাথরের মতো চাপিয়া বসিয়া আছে। গতকাল মঙ্গলবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের ক্যানসার চিকিত্সার জন্য আনা খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের রেডিওথেরাপি মেশিনটি দীর্ঘ আট বত্সর ধরিয়া বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়িয়া আছে। ফলে ১৫ কোটি টাকা মূল্যের ঐ মেশিন মানুষের চিকিত্সাসেবায় কোনো কাজে আসিতেছে না।
তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা হইল, এমন বাস্তবতার মধ্যেও খুলনায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০ শয্যার ক্যানসার সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়াছে সরকার। অথচ ইতিপূর্বে বরাদ্দকৃত ১৫ কোটি টাকা মূল্যের রেডিওথেরাপি মেশিনটি অযত্ন-অবহেলায় পড়িয়া থাকিয়া নষ্ট হইতেছে। বিস্ময় জাগে! ১৫ কোটি টাকা কি কোনো টাকাই নহে! ক্যানসারের আধুনিক চিকিত্সা যথেষ্ট ব্যয়সাপেক্ষ। বিগত কয়েক দশকে ক্যানসারের সমস্যা আমাদের অধিক হারে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইয়াছে। হাজার হাজার পরিবার এই চিকিত্সায় সর্বস্বান্ত হইয়াছে। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, খুমেক হাসপাতালে ক্যানসার ইউনিটে কোনো ইনডোর ওয়ার্ড নাই। বহির্বিভাগে মাত্র দুই জন চিকিত্সক থাকিলেও এক জন অধিকাংশ সময় খুলনার বাহিরে থাকেন। খুমেক রেডিওথেরাপি ও অনকোলজি বিভাগের প্রধান আরো জানাইয়াছেন, বেশ কয়েক বত্সর পূর্বে তাহার বিভাগে লিনিয়ার এক্সেলেটর মেশিন আসিলেও তাহা আজ অবধি স্থাপন করা হয় নাই। মেশিনটির উচ্চমাত্রার রেডিয়েশন হইতে সুরক্ষার জন্য বাংকার তৈরি করা প্রয়োজন। তিনি দাবি করিয়াছেন, এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করিয়াও কোনো ফল হয় নাই। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, কেবল অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটাইলেই কিংবা কিছু চিকিত্সক নিয়োগ দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। চিকিত্সকরা কর্মস্থলে থাকিতেছেন কি না—তাহা সবচাইতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করিবার জন্য ছয়টি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। ইহা হইল—প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, চিকিত্সকসহ পর্যাপ্ত জনবল, চিকিত্সা-সরঞ্জাম, তথ্য-উপাত্ত, সেবাদানের সঠিক নির্দেশিকা ও যথাযথ ব্যবস্থাপনা। ইহার যে কোনো একটির অনুপস্থিতিতে অন্যটি ঠিকভাবে কাজ করিতে পারে না। বাংলাদেশের মফস্সল পর্যায়ে এই ছয়টি অনুষঙ্গের মধ্যে একাধিক বিষয়ের ঘাটতি থাকে প্রায় সকল সময়ই।
চিকিত্সা খাতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ প্রশংসীয় হইলেও সেই সেবা যদি শেষাবধি রোগীদের কাজেই না লাগে, তাহা হইলে তাহার সার্থকতা কোথায়? ইহা কি কেবল যন্ত্রপাতি ক্রয়-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত লাভের জন্য? চিকিত্সার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার ছাপ কেন থাকিবে না সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে? তৃণমূল স্তরে সমস্যার নির্দেশ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যথাযথ সিদ্ধান্তের অবহেলা কবে দূর হইবে?
