নক্ষত্রের পতন

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২০, ২০:৫২

 ‘একজন পেশাদার চলচ্চিত্রাভিনেতা আমি। আমার সম্ভাবনা, আমার অভিনয় করার ক্ষমতা, আমার শ্রম আমি বিক্রি করি—এই আমার পেশা।...যারা কেনে তারা আমার...অভিনয় করার ক্ষমতাটুকু নিষ্কাশিত করে নেয়।’ একাদিক্রমে ষাট বত্সরের অভিনয়জীবন পার হয়ে এসে এমন উক্তি করতে পারেন একমাত্র সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। বহুমাত্রিক চরিত্রের অধিকারী এই মানুষটি আমাকে আকৃষ্ট করে আমার বাল্যকাল থেকেই। আর তাই তার মতো একজন আধুনিক অভিনেতাকে নিয়ে তার জীবন ও কর্মভিত্তিক তথ্যচিত্র নির্মাণের অভিপ্রায় ব্যক্ত করার পর তা তিনি সানন্দে গ্রহণ করাটা আমার পরম পাওয়া।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম কলকাতায় হলেও নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে কেটেছে তার ছেলেবেলা। আদি নিবাস ছিল অবিভক্ত ভারতের নদীয়া মহকুমা কুষ্টিয়ায়, শিলাইদহ থেকে আট মাইল দূরে, গ্রামের নাম কয়া। সৌমিত্র একবার গিয়েছিলেন সে গ্রামে। বাল্যশিক্ষা কৃষ্ণনগরে শুরু হলেও পিতার যে বদলির চাকরি তাই কখনো বারাসাত, কখনো হাওড়া, দার্জিলিংয়ে তার শিক্ষাজীবন কাটে। বাড়িতে বইপড়া, আবৃত্তিচর্চার রেওয়াজ ছিল। বাবা আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা হয়ে পুরস্কৃতও হন। এই পারিবারিক পরিবেশে, আর কৃষ্ণনগরের নাগরিক সুবাতাসে সৌমিত্রর বাল্যজীবন কাটে। পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত সৌমিত্র জীবনে প্রথমবারের মতো মঞ্চে নামেন অভিনয় করতে। তারপর তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবেই অভিনয় করে যাচ্ছেন।

এই খ্যাতিমান অভিনেতাকে নিয়ে আমার নির্মিত তথ্যচিত্র ‘কৃষ্ণকলি’ দুই বাংলার দর্শকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। ২০১৫-এর ১৮ এপ্রিল কলকাতায় প্রদর্শনীর পর বিশিষ্ট পরিচালক গৌতম ঘোষ অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে তাই যথার্থই বলেছেন, ‘সৌমিত্রদাকে নিয়ে এত বিশদভাবে পূর্বে কেউ তুলে ধরেননি।’ অনুষ্ঠানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন।

একটা অভিজ্ঞতার কথা মনে হলো। এই বিশাল মাপের মানুষকে নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণের উদ্যোগ আমার জন্য একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল বইকি। ২০১৪-এর ২৫ জুলাই। কলেজ স্ট্রিটের লাহাবাড়িতে দিনব্যাপী শুটিংয়ের আয়োজন। ইউনিটের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। সমস্যা হলো শুরুটা করব কীভাবে? দাদাকে কীভাবে নির্দেশ দেব ক্যামেরা -> রোল -> রোলিং -> অ্যাকশন -> কাট। সৌমিত্রদা আমার অসহায়ত্বের দৃশ্যটি অবলোকন করে কিছু বলার আগেই, আমি তার শরণাপন্ন হলাম। পর্বত পরিমাণ ভীতি নিয়ে আমি তাকে জিগ্যেস করলাম, ‘দাদা, একটু সমস্যায় পড়ে গেলাম, আসলে আমি শুরুটা কীভাবে করব তা ভেবে পাচ্ছি না।’ এর পরের কথাগুলো দাদাকে আর বলতে হয়নি। বিলম্ব না করে তিনি বললেন, ‘শোনো মাসুদ, ১৯৫৮-এর ৯ই আগস্ট আমি সত্যজিত্ রায়ের নির্দেশনায় অপুর সংসারে ক্যামেরার সামনে আসি; আজ ২০১৪-র ২৫ জুলাই, তুমি যা নির্দেশ দেবে আমি তা-ই করব।’ তার এই উক্তির পর তিনি যে একজন বিশাল উদার মনের মানুষ, তা আবার নতুন করে প্রকাশ পেল। কাজের ক্ষেত্রে নিষ্ঠা, সততা, দক্ষতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জন্য আজও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের স্থানটিতে তিনিই যেন অদ্বিতীয়। ‘কৃষ্ণকলি’ নির্মাণের পর সংগত কারণেই দাদার সঙ্গে আমার একটা আলাদা সম্পর্ক তৈরি হয়। ২০১৫ এপ্রিলের পর আমি যতবার কলকাতা গিয়েছি ততবার সৌমিত্রদাকে ফোন করলেই বলতেন, ‘কাল চলে আসো, চা খাবে।’ ২৯ জুন বেলা ১১টায় ফোন করি কলকাতায়। ১০০ সেকেন্ড কথা হয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। বলার চেষ্টা করি সময়টি মোটেই ভালো নয়। এ মুহূর্তে সুস্থ থাকাটা খুব জরুরি। সৌমিত্রদা যাতে শুটিংয়ে না যান। যদিও বয়সে যারা ছোট তাদের কথা বড়রা খুব একটা আমলে নিতে চান না। মনে করা হয়, এসব কথার কথা।  

সৌমিত্রদা বললেন, শুটিং এখনো শুরু করিনি, তবে জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে একটু আধটু কাজ তো করতেই হবে।

সৌমিত্রদার কথাটি আমার মোটেও পছন্দ হয়নি। মনে একটা অজানা শঙ্কা কাজ করছিল। এই বয়সে এমন একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকে দাদা শুটিংয়ে না গেলেই কি নয়? আবার ভাবলাম, দাদার জন্য আমার এই শঙ্কাটা যেন অতিরঞ্জিত হয়ে যাচ্ছে। এতটা শঙ্কিত না হলেও চলে।

অপর প্রান্ত থেকে দাদা বললেন, ‘তোমরা সাবধানে থেকো, বাড়ির সব্বাইকে আমার শুভেচ্ছা।’ মাত্র ১০০ সেকেন্ডের কথা। সেদিনের পর সৌমিত্রদার সঙ্গে আমার আর কথা হয়নি। জুলাই-আগস্ট পেরিয়ে সেপ্টেম্বর। অনেক দিন দাদার কণ্ঠ শুনি না। ফোন করলে নাম বলার আগেই অপর প্রান্ত থেকে বলতেন, ‘বলো মাসুদ, খবর কী?’

আগস্টে কলকাতার একটি বাংলা পত্রিকায় সৌমিত্রদার সাক্ষাত্কারভিত্তিক সংবাদ ছাপা হয়। সংবাদটি দেখে আমি অনেকটা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। সংবাদের শিরোনামটি আমাকে আহত করে। এই বর্ষীয়ান অভিনেতাকে কেন এখনো ডাল-ভাতের জন্য শুটিংয়ে নামতে হবে। ভীষণ রাগ হলো দাদার সন্তানদের প্রতি। অনেকটা অভিমানের রাগ, অধিকারের রাগ। রাগ তো তাদের ওপরই মানায় যাদের ওপর অধিকার আছে মনে করা হয়। আমার ধারণা, ‘ভয়কে জয় করে নয়, বরং সৌমিত্রদাকে অনেকটা জোর করেই শুটিংয়ে নামানো হয় প্রযোজকদের চাহিদার কারণে। পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় এর নেপথ্যে কাজ করেছেন।’

এরপর যা হবার তা-ই হলো। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পুত্র সৌগত চট্টোপাধ্যায় ৬ অক্টোবর রাতে আমাকে ফোনে জানালেন, বাবাকে পারিবারিক সিদ্ধান্তে মিন্টো পার্কে বেলভিউ ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। করোনা পজিটিভ!

n লেখক :চলচ্চিত্রকার