দীর্ঘ ২১ বছর ধরে ফেনীর সঙ্গে বিলোনিয়ার রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে এ রেল পথটির কাজ চালু হওয়ার কথা থাকলেও জরিপের কাজ শেষ হলেও দীর্ঘ ছয় বছরেও প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ উদ্যোগে ২৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার রেললাইন পুনঃস্থাপনের জরিপের কাজ শেষ হয়। রেললাইনটি নির্মাণে ৬০০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত বাজেট ধরা হয়। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ভারত নিজ দেশের এক অংশ থেকে অন্য অংশে সহজে পণ্য বহনের সুবিধা পাবে। ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার হবে ফেনী ও চট্টগ্রাম বন্দর। ভারতের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে বন্ধ এ রেলপথ পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় দুই দেশের সরকার।
ভারতীয় পণ্য বহনের পাশাপাশি বন্ধ থাকা ফেনী-বিলোনিয়া যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলও সচল হবে বলে জানান সাবেক রেলপথ মন্ত্রী মুজিবুল হক। এজন্য এ রেলপথে পরিত্যক্ত আটটি স্টেশন পুনরায় নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রেলপথটি পুনরায় কবে চালু হবে এ ব্যাপারে রেল কর্তৃপক্ষ এখনো কিছুই বলতে পারছে না বলে জানান। ফেনী রেল কর্তৃপক্ষ জানান, রেলপথটি চালু হলে চট্টগ্রাম-ফেনী এবং ভারতের মধ্যে ত্রিমুখী যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে ফেনী স্টেশন পুনরায় জংশনের মর্যাদা পাবে। তবে দীর্ঘ ২২ বছর রেলপথ বন্ধ থাকায় রেলের বেহাত হওয়া মূল্যবান সম্পত্তি, রেলের জমি চিহ্নিত এবং তা অবৈধ দখলদারদের থেকে মুক্ত করা এ মুহূর্তের একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটেন্টস কোম্পানিকে সহযোগিতা করার জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) প্রধান প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক চিঠি তত্কালীন ফেনী জেলা প্রশাসক মনোজ কুমার রায়ের কাছে পাঠানো হয় যেন ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে উক্ত প্রতিষ্ঠানকে সর্বত্র সহযোগিতা করা হয়। ২০১৭ সালে রেলের যাবতীয় সম্পত্তি শনাক্ত, অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিতকরণসহ প্রাথমিক কাজ শেষ করে জরিপকার্য সম্পন্ন করে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটি। তবে জরিপের প্রতিবেদন বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) সংশ্লিষ্ট বিভাগে জমা হওয়ার পর প্রকল্প অনুমোদনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে। ফেনী জেলা প্রশাসনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করার কথা থাকলেও রেললাইন পুনর্নির্মাণের আনুষ্ঠানিক কাজ এখনো শুরু হয়নি।
এদিকে রেলওয়ের অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিলোনিয়ায় রেললাইন নির্মাণ সমীক্ষার কাজ শেষ করেছে সে দেশের সরকার। ভারতের আগরতলা স্টেশন থেকে বিলোনিয়া পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণে ৪০ একর ভূমিও অধিগ্রহণ করেছে তারা।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৭ সালে লোকসানের অজুহাতে বন্ধ হয়ে যায় যাত্রীবাহী ফেনী-বিলোনিয়া রেল যোগাযোগ। বর্তমানে এ পথে আটটি রেল স্টেশন—বন্ধুয়া, দৌলতপুর, আনন্দপুর, পীরবক্স মুন্সীর হাট, নতুন মুন্সীর হাট, ফুলগাজী, পরশুরাম ও বিলোনিয়া স্টেশন ভবনগুলো ভেঙেচুরে ভূতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। লুট হয়ে গেছে এসব স্টেশনের লাখ লাখ টাকার স্লিপারসহ দামি আসবাবপত্র, দরজা-জানালা। এছাড়াও ২৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের রেললাইনের অনেক জায়গায় রেলপাত ও স্লিপার চোরেরা চুরি করে নিয়ে যাওয়ায় রেলপথের অস্তিত্ব আজ বিলীন হওয়ার পথে। এসব ঘটনায় লাকসাম জিআরপি থানায় ৩০টির বেশি মামলা দায়ের করা হলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি।
উল্লেখ্য, ১৯২৯ সালে ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথটি চালু হয়। সে সময় এপথে সড়ক যোগাযোগ না থাকায় ফেনী, ফুলগাজী, পরশুরাম, বিলোনিয়ার সাধারণ মানুষের একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম ছিল রেলপথ এবং এই রেলপথটি ভারতের বিলোনিয়ার মহকুমায় গিয়ে শেষ হয়। ১৯৭১ সালের পর রেলের পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগের উন্নতি হওয়ায় গুরুত্ব কমে যায় এ রেলপথটির। পরে লোকসানের কারণে এই রেলপথ বন্ধ ঘোষণা করেন তত্কালীন সরকার।
