সিলেটে বিদ্যুত্ কেন্দ্রে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২০, ২২:২১

সিলেটের কুমারগাঁও ১২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্রে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্পর্শকাতর এমন একটি স্থানে হঠাত্ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান প্রকৌশলী ইকবাল আজমের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিন দিনের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক কাজী এমদাদুল হক। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশরীরা দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তাকে আশ্বস্ত করেছেন।

অন্যান্য দিনের মতো স্বাভাবিক কার্যক্রম চলাকালে গতকাল সকাল ১১টার দিকে হঠাত্ই সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের পাশে কুমারগাঁও ১২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উপকেন্দ্রে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তে আগুনের লেলিহান শিখা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্ক দেখা দেয় আশপাশের এলাকায়। দিগিবদিক ছুটতে থাকেন স্থানীয় ও পথচারীরা। পরে ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিটের প্রায় ১ ঘণ্টা চেষ্টার পর দুপুর সোয়া ১২টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ সময় ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মী আহত হন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা ১১টার দিকে হঠাত্ বিকট আওয়াজের পর তারা আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পান। পরে আগুন বাড়তে থাকে। অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে না আসায় সিলেট ছাড়াও মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা বিদ্যুত্হীন হয়ে পড়ে। প্রথমে ফায়ার ব্রিগেডের পাঁচটি ইউনিট কাজ শুরু করে। পরে আরো দুটি ইউনিট যোগ দেয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন নেভাতে গিয়ে জয়ন্ত কুমার নামে ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্য দগ্ধ হন। তাকে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সিলেটের উপপরিচালক শওকত হোসেন বলেন, ট্রান্সমিটারের জ্বালানি তেল থেকে এই আগুনের সূত্রপাত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। সিলেট পল্লী বিদ্যুত্ উন্নয়ন ও বিতরণ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মোকাম্মেল হোসেন বলেন, আগুনে দুটি ট্রান্সফরমার পুড়ে গেছে। এ অবস্থায় পুরো সিলেটে বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ। এতে ২০ লাখের মতো গ্রাহক বিদ্যুত্হীন অবস্থায় আছেন। আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে তিনি বলেন, সাব স্টেশনে অনেকগুলো প্যানেল আছে। কোনটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে এখনই তা বলতে পারছি না। তবে আগুনে বিদ্যুত্ উপকেন্দ্রের ‘বেশ ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে।

বিদ্যুত্ বিভাগের পরিচালক (পিআর) সাইফুল হাসান চৌধুরী জানান, বিদ্যুত্ বিভাগ পরিস্থিতি উত্তরণের চেষ্টা চালাচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুত্ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে সিলেট নগরীতে বিদ্যুত্ সংযোগ চালু হতে আরো সময় লাগবে।

এদিকে সকালে হঠাত্ই এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুরো সিলেট বিদ্যুত্হীন হয়ে পড়ে। সন্ধ্যায় অন্ধকারে পতিত হয় প্রায় ২০ লাখ বিদ্যুত্ গ্রাহক। বিভাগীয় নগরী ভূতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়। দুপুর থেকেই বাসা-বাড়ি, মসজিদে পানিসহ নানা সংকট সৃষ্টি হয়। অফিস, আদালত, ব্যাংক, বিমাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রায় অচল হয়ে পড়ে। হাসপাতাল, ক্লিনিকসহ জরুরি সেবা ব্যাহত হয়। অনেক ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকায় যানবাহন জ্বালানি সমস্যায় পড়ে। জনজীবনে মারাত্মক দুর্ভোগ দেখা দেয়। মোবাইল, ইন্টারনেট সমস্যা প্রকট হয়ে উঠে। গতকাল রাত ৭টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিদ্যুতের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসেনি। এছাড়া ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শেষ খবর পর্যন্ত কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

পিজিসিবি সূত্র বলছে, কুমারগাঁও উপকেন্দ্র থেকে ছাতক, সুনামগঞ্জ এবং বিয়ানীবাজার উপকেন্দ্রে বিদ্যুত্ সরবরাহ করা হয়। এই উপকেন্দ্রে চারটি ১৩২/৩৩ কেভি ট্রান্সফরমার রয়েছে। এর মধ্যে একটি ট্রান্সফরমার পুড়ে গেলেও বাকি তিনটি ভালো আছে বলে আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে। এখন উপকেন্দ্রের অন্য তিনটি ট্রান্সফরমার পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। সেগুলো ঠিক থাকলে বিদ্যুত্ সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে।

অন্যদিকে সিলেট বিদ্যুত্ কেন্দ্রে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় অনেকেই বিস্মিত, আতঙ্কিত। অনেকেই প্রশ্ন রেখে বলেন, এটা কোনো পরিকল্পিত ঘটনা, দুর্ঘটনা, নাকি যথাযথ মেরামত বা যত্ন-আত্তির অভাবে এমন বিপর্যয়। বিদ্যুত্ কেন্দ্রের গেট সংলগ্ন শাবির মেকানিক্যাল বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানান, তারা প্রায়ই ঐ বিদ্যুত্ কেন্দ্রে ধোঁয়া দেখতেন।