করোনায় দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যু

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২০, ২২:২৪

করোনা ভাইরাসে দেশে এক দিনেই আরো ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। যা গত ৫৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ২ হাজার ২১২ জনের শরীরে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে, যা গত ৭৬ দিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ বেড খালি নেই। স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না অনেকে। মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্তও কার্যকর হচ্ছে না। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ব্যাপক হারে দেখা দিতে পারে। আর স্বাস্থ্যবিধি না মানার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে যাবে। এদিকে হোটেলে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ায় করোনা রোগীদের চিকিত্সাসেবায় নিয়োজিত ডাক্তার-নার্সদের ঝুঁকি বেড়েছে। দেখা দিয়েছে চিকিত্সকদের মধ্যে অসন্তোষ। পরিবারকে ঝুঁকিতে রেখে আর কতদিন তারা সার্ভিস দেবে? এমন প্রশ্ন রেখে ডাক্তাররা বলেন, এতে দায়িত্ব পালনে চিকিত্সকদের অনীহা দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ হাসপাতালে জুনিয়র ডাক্তাররা সেবা প্রদান করছেন। সিনিয়র ডাক্তাররা নিষ্ক্রিয় থাকছেন।

বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সভাপতি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, সরকারি-বেসরকারি কোনো হাসপাতালে আইসিইউ বেড খালি নেই। আর আইসিইউ ব্যবস্থাপনা অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ছাড়া সম্ভব না। এদিকে রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় হূদেরাগ ইনস্টিটিউট, ক্যানসার ইনস্টিটিউট, পঙ্গু হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, করোনার প্রাদুর্ভাবে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ বেডের জন্য হাহাকার চলছে। কোথাও সিট খালি নেই। একটা আইসিইউ বেড যেন সোনার হরিণ। অনেক রোগী আইসিইউ বেডের অপেক্ষায় রয়েছেন। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখানো হচ্ছে আইসিইউ বেড খালি আছে। গতকাল প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঢাকা মহানগরীতে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে সাধারণ শয্যা সংখ্যা ৩ হাজার ৫২৫টি, সাধারণ শয্যায় ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৯৫০ জন ও শয্যা খালি আছে ১ হাজার ৫৭৫টি। ঢাকাসহ সারা দেশে আইসিইউ শয্যা সংখ্যা ৫৫৯টি, রোগী ভর্তি আছে ২৭৭ জন এবং খালি আছে ২৮২টি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হঠাত্ রোগী বৃদ্ধি পেয়েছে। সোমবার ছিল ৬২ জন রোগী। গতকাল ছিল ৭০ জন।

ঘরের বাইরে মাস্কের ব্যবহার নিয়ে সরকারের প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনার অভাব নেই। মাস্ক না পরলে জেল-জরিমানার বিধানও রয়েছে। তার পরও সময় যত এগোচ্ছে, জনগণের মধ্যে মাস্ক ব্যবহারের উদাসীনতা তত বাড়ছে। সামনে শীতে করোনার সংক্রমণ বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কায় সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ নীতি বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মাস্ক ছাড়া এলে কাউকে সরকারি ও বেসরকারি অফিসগুলোতে সেবা দেওয়া হবে না।

করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খান মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, অনেকে মাস্ক পরে না, স্বাস্থ্যবিধি মানে না। ইচ্ছামতো চলাফেরা করছে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছে না। প্রশাসনের কথাও শোনে না। মন্ত্রিপরিষদের নির্দেশনাও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। নো মাস্ক, নো সার্ভিস সবক্ষেত্রে কার্যকর করতে হবে। নইলে সামনে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, নো মাস্ক, নো সার্ভিস কার্যকর করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদসহ সব জায়গায় জনগণকে সচেতন করতে প্রচারণা চালাতে হবে। নইলে সামনে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসলে তা মোকাবিলা করা কষ্টকর হবে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, করোনায় এ পর্যন্ত ১০৪ জন ডাক্তার, ১২ জন নার্স, ৫ জন টেকনিশয়ান এবং সাত জন স্বাস্থ্য কর্মী মারা গেছেন। সব মিলিয়ে ৮ হাজার ডাক্তার, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের হোটেলে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে ডাক্তাররা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নিরুত্সাহিত হচ্ছেন। একজন জুনিয়র ডাক্তার বলেন, একটানা আট মাস কাজ করছি। থাকার জায়গা দেওয়া না। এতে পরিবারের সদস্যদের আমরা ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছি।