সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক এবং মুক্ত অর্থনীতির রাষ্ট্র হলেও মহাত্মা গান্ধী যে সাম্য এবং শান্তির সমাজ চেয়েছিলেন তার সঙ্গে আজকের ভারতের মিল খুব কম। বইয়ে ওবামা ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। যদিও রাহুল গান্ধীকে অপরিপক্ক বলে উল্লেখ করেছেন।
ভারত প্রসঙ্গে ওবামা
৯০২ পৃষ্ঠার বইয়ে আধুনিক ভারত প্রসঙ্গে ওবামা লিখেছেন, বারবার সরকার পরিবর্তন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রচ্ল বিভেদ, নানারকম সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী ও বিদ্রোহী তত্পরতা এবং দুর্নীতির নানারকম কেলেংকারি সত্ত্বেও ভারত রাষ্ট্র অক্ষত। তিনি বলেন, বৈষম্য বাড়ছে এবং সহিংসতা ভারতীয় সমাজের অংশ হিসেবে রয়ে যাচ্ছে।
ওবামা লিখেছেন, ২০১০ সালে নভেম্বরের রাতে মনমোহন সিংয়ের বাসভবন থেকে বেরিয়ে তিনি ভাবছিলেন ৭৮ বছরের এই মানুষটি যখন ক্ষমতা ছাড়বেন তখন এই দেশের অবস্থা কী দাঁড়াবে? রাহুল কী সফলভাবে সামলাতে পারবেন, মায়ের যে রাজনৈতিক অভিলাষ তিনি কি তা পূরণ করতে পারবেন? বিজেপি যে বিভেদমুলক জাতীয়তাবাদের ধারণা তুলে ধরতে চাইছে তা সামলে তিনি কি কংগ্রেস পার্টির প্রাধান্য ধরে রাখতে পারবেন? তিনি লিখেছেন, কেন যেন আমার সন্দেহ হয়েছিল। এতে মনমোহন সিংয়ের কোনো দোষ ছিলনা। তিনি তার ভূমিকা পালন করেছিলেন। শীতল যুদ্ধ পরবর্তী উদারপন্থি গণতন্ত্রের সব সূত্রই তিনি অনুসরণ করেছিলেন, সংবিধান সমুন্নত রেখেছিলেন, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছিলেন, পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষার পরিধি বাড়িয়েছিলেন। তবে ওবামা লিখেছেন, তিনি নিজেও প্রায়ই ভাবেন যে সহিংসতা, লোভ, দুর্নীতি, জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার মত প্রবৃত্তিগুলোকে কি গণতন্ত্র আসলেই স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে?
মনমোহন সিং ও সোনিয়া গান্ধীর প্রশংসা
ওবামার আত্মজীবনীমুলক নতুন বই ‘অ্যা প্রমিজড ল্যান্ড’ যার প্রথম খণ্ড মঙ্গলবার থেকে বিক্রি শুরু হয়েছে। ভারতে বইটি বেশ তোলপাড়া ফেলেছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০১০ সালের নভেম্বরে ভারতে তার সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৪০০ শব্দের যে অধ্যায়টি লিখেছেন, তাতে ওবামা সেই সময়কার কংগ্রেস সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। মনমোহনকে তিনি ভারতীয় অর্থনীতির রূপান্তরের প্রধান কারিগর ও জ্ঞানী, চিন্তাশীল এবং অসামান্য সত্ একজন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কংগ্রেসের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধীর ব্যক্তিত্ব তাকে কতটা মুগ্ধ করেছিল সে কথাও লিখেছেন ওবামা। কিন্তু সেই সঙ্গে কংগ্রেসের বর্তমান কাণ্ডারি রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক ধীশক্তি নিয়ে তার মনে তখন যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল তা অকপটে লিখেছেন ওবামা।
ওবামা লিখেছেন, মুখোমুখি কথা হওয়ার সময় মনমোহন সিং বলেছিলেন, মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাবের বিস্তার এবং তার ফলে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপির শক্তি এবং প্রভাব বৃদ্ধি নিয়ে তিনি শংকিত। মুম্বাইতে যে সন্ত্রাসী হামলায় ১৬৬ জন নিহত হয়েছিল তারপর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রচণ্ড চাপ তৈরি হলেও তাতে সায় দেননি মনমোহন সিং। কিন্তু তার সেই সংযমের রাজনৈতিক মূল্য তাকে দিতে হয়েছে।
প্রতিবেশি পাকিস্তানের সঙ্গে বৈরিতা নিয়েও মনমোহন নিজের উদ্বেগের কথা ওবামাকে বলেছিলেন। ওবামা লিখেছেন, সেই সঙ্গে ছিল পাকিস্তান সমস্যা। ২০০৮ সালে মুম্বাইতে সন্ত্রাসী হামলা তদন্তে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতায় পাকিস্তানের অব্যাহত ব্যর্থতায় দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা বেড়েছে। তদন্তে সহযোগিতার অভাবের একটি কারণ হয়তো ছিল লস্কর-ই-তৈয়বা নামে যে সন্ত্রাসী সংগঠনটি এই হামলার জন্য দায়ী তার সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগের সম্ভাবনা।
সোনিয়া গান্ধীকে ওবামা বর্ণনা করেছেন, শাড়ি পরা ষাটোর্ধ অত্যন্ত আকর্ষণীয় একজন নারী যার ঠাণ্ডা কালো চোখে জানার অনেক ইচ্ছা এবং যার উপস্থিতি একটি রাজকীয় আবহ সৃষ্টি করে। ওবামা লিখেছেন, ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত একজন গৃহবধূ এবং মায়ের পক্ষে আত্মঘাতী হামলায় নিহত স্বামীর শোক কাটিয়ে উঠে একজন নেতৃস্থানীয় জাতীয় রাজনীতিক হয়ে ওঠা প্রমাণ করে ভারতে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির শক্তি কতটা। এক নৈশভোজের সময় ওবামা লিখেছেন, সোনিয়া গান্ধী কথা বলার চেয়ে শুনেছেন বেশি। রাষ্ট্রীয় নীতি বিষয়ক কোনা প্রসঙ্গ উঠলেই নিজে কথা না বলে তা ঠেলে দিয়েছেন মনমোহন সিংয়ের দিকে। বারবারই তিনি আলোচনায় ছেলেকে সম্পৃক্ত করতে চাইছিলেন। আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে তার ক্ষমতার উত্স ছিল তার ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তা।
