হাওর পাড়ের সোনার মেয়েগুলো

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২০, ১৭:৫৫

 

হেমন্তের প্রথম দিক। সকাল ৮টা, দিরাই উপজেলার ভাঙ্গাডহর গ্রাম থেকে নৌকা ছাড়ে দিরাইবাজারের  উদ্দেশ্যে। নৌকার যাত্রীদের সঙ্গে আছে লিজা নামের মেয়েটিও। নৌকা থেকে নেমে প্রায় এক ঘণ্টা পায়ে হেঁটে দিরাই স্টেডিয়ামে পৌঁছে সে। তার মতোই আরো শ’খানেক মেয়ে বিভিন্ন হাওর আর ভাঙাচোরা রাস্তা পাড়ি দিয়ে এসেছে এখানে। উদ্দেশ্য ফুটবল খেলা। রক্ষণশীল একটা এলাকার মেয়েরা ফুটবল খেলবে!

বলছিলাম সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার স্বপ্নচূড়া এফসি স্পোর্টিং ক্লাবের একদল স্বপ্নবাজ মেয়ের কথা। ভাটির এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে উঠেছে মেয়েদের ফুটবল ক্লাব। সামাজিক বাধা-বিপত্তি মাড়িয়ে ক্লাবটিতে এখন ৮০ জনের মতো কিশোরী ফুটবল খেলছে। প্রতিদিন যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাওরগুলো নৌকায় পাড়ি দিয়ে আসে দিরাই উপজেলার স্টেডিয়ামে। রোদ-বৃষ্টি যাই হোক, থামেনি তাদের অনুশীলন। 

মেয়েদের ঘরে আটকে রাখার দিন যে ফুরিয়ে গেছে, তারই জলন্ত উদাহরণ হাওর পাড়ের এইসব মেয়ে। এর নেপথ্যে কাজ করছেন সাহসী এক যুবক রাকিব আহমেদ। তাঁর স্বপ্ন ছিল ফুটবলার হওয়ার। খেলবেন জাতীয় দলের খেলোয়াড় হিসেবে। কিন্তু ইনজুরি আর নানা জটিলতায় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হলেও অদম্য রাকিব থামেননি। ভাটির মেয়েদের দিয়েই নিজের স্বপ্নকে সার্থক করতে গড়ে তোলেন ‘স্বপ্নচূড়া’ নামের ফুটবল ক্লাবটি।

একে তো রক্ষণশীল এলাকা, যেখানে ধর্মীয় ও সামাজিকতার দোহাই দিয়ে মেয়েদের ঘর থেকে বের হতেই দেওয়া হয় না। তার ওপর গ্রাম্য রাজনীতি তো আছেই। এমন পরিস্থিতিতে মেয়েদের মাঠে এসে ফুটবল খেলা তো কল্পনা ছাড়া কিছুই না। কিন্তু রাকিব দমে যাননি। গ্রামে গ্রামে ঘুরে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন। এক সময় মানুষের ধারণা পালটাতে শুরু করে। মেয়েরা আসতে থাকে ফুটবল ক্লাবে। মাত্র ৯ জন মেয়ে নিয়ে শুরু হলেও স্বপ্নচূড়ায় এখন শতাধিক মেয়ে ফুটবল খেলছে। মেয়েদের অনুশীলন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় ফুটবল খেলতে যাওয়ার জন্য টাকার দরকার হয়। মাঝে মধ্যে দু-একজন প্রবাসী ও হূদয়বান কিছু ব্যক্তির অনুদানে কোনোরকম  চালিয়ে নিচ্ছেন তিনি।

২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ক্লাবটি এরই মধ্যে নিজেদের নিয়ে গেছে স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায়ে। ক্লাবের  মেয়েরা দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সাহসিকতার সঙ্গে নিয়মিত খেলে যাচ্ছে। ছিনিয়ে নিয়ে আসছে একের পর এক গৌরবময় বিজয়। প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যেই আয়েশা, পূর্ণিমা, পলি, একা, মৌ ও জুবলী বেগম—ক্লাবের এই ছয় কিশোরী জাতীয় ফুটবল লিগে অংশ নিয়েছে। এ বছরের প্রথমদিকে বাংলাদেশ মহিলা ফুটবল প্রিমিয়ার লিগে অংশ নেওয়ার জন্য সপ্তম দল হিসেবেও তালিকাভুক্ত হয়েছিল স্বপ্নচূড়া।

শুধু তা-ই নয়, স্বপ্নচূড়া  এফসি-র মেয়েদের ফুটবলের খবর পৌঁছে গেছে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনেও। কিছুদিন আগে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার নজরে আসে এদের নৈপুণ্যের খবর। এ নিয়ে ফিফার অফিসিয়াল টুইটার অ্যাকাউন্ট (ফিফা উইমেন্স ওয়ার্ল্ড কাপ) থেকে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। যেখানে একটি ভিডিওর পাশাপাশি  ফিফা লেখে—‘এ গ্রহে ফুটবল হচ্ছে বৈশ্বিক ভাষা। বৃষ্টির মৌসুমে বিভিন্ন কারণে প্রায়ই সমস্যা দেখা দেয়। এই মেয়েরা (স্বপ্নচূড়া) প্রায়ই সমালোচনার শিকার হয়। কিন্তু তারা লক্ষ্যে অবিচল। ৬ কিলোমিটার দূর থেকে নৌকায় এসে অনুশীলন করে ওরা।’ বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন অনুপ্রেরণামূলক সাড়ায় ব্যাপক আনন্দিত স্বপ্নচূড়ার মেয়েরা।

স্বপ্নচূড়ার প্রতিষ্ঠাতা রাকিব আহমেদ জানান, এমন একটি  অঞ্চলে গড়ে ওঠা মেয়েদের ফুটবল দলটি ফিফার নজর কাড়বে ভাবতেই পারেননি তিনি। একদিন এই মেয়েরা দেশের হয়ে ফিফার ওয়ার্ল্ড কাপে খেলবে, প্রত্যাশা রেখে রাকিব বলেন, ‘ভাটির এই কিশোরীরাই একদিন বিশ্বজয়ের হাসিতে মাতবে।’