মায়ের কাছে শিখেছি মানবিকতা, বাবার কাছে সংগঠকের দীক্ষা

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২০, ২০:০৪

র ফি কু ল  ই স লা ম

 

শিল্পী অধ্যাপক মোস্তাফিজুল হক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক। সেইসঙ্গে তিনি শান্ত-মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান। তত্কালীন ঢাকা আর্ট কলেজ থেকে পাশ করে জাপানে চিত্রশিল্পের ওপর উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণ। চারুকলা অনুষদের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং একজন শিশু চিত্রশিল্প গবেষক। বেসরকারি পর্যায়ে দেশের প্রথম সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং দেশে প্রতিষ্ঠা করেন বহুবিধ আর্ট স্কুল। একজন আলোকিত মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার পেছনে বাবার শিক্ষার কথাই বললেন তিনি। তার ভাষ্যে, আমার বাবা ড. জহুরুল হক ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী, উদ্যোক্তা ও সমাজসেবক। আমার মা গৃহীনি সাহেবুন্নেসা। পাঁচ ভাই-বোনের সংসারে বড় ভাই নূরুল হক, মেজ ভাই মাহমুদুল হক ও আমি মোস্তাফিজুল হক এবং দুই বোন—সাহারা খাতুন ও ঝর্না খাতুন।

আমার জন্ম রামপাল উপজেলার সিফলতলা গ্রামে ১৯৫৭ সালে। বাবা ১৯৬১ সালে গ্রামে একটি প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ঐ সময়ে গ্রামে মাতব্বরদের আধিপত্য ছিল। তাদের ছিল বিশাল লাঠিয়াল বাহিনী। তখন বাবার গড়া স্কুলে প্রায়ই হামলা হতো, দেখা যেত প্রতিদিনই স্কুলে কোথাও ভেঙ্গে ফেলেছে এর চালা বা এটা-ওটা নদীতে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বাবা বিন্দুমাত্র ক্ষিপ্ত না হয়ে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো সংস্কার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত থাকতেন। অন্তত এই কাজে উনার মধ্যে কোনো বিরক্তি ছিল না। তিনি চেয়ে চিন্তে প্রতিদিনই একটু একটু করে কোনো না কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করতেন প্রিয় স্কুলটির। প্রয়োজনে নিজেই শিক্ষকতা করতেন। বাবার উদ্দেশ্য ছিল গ্রামের শিক্ষাহীন অন্ধকার লোকালয়গুলোকে আলোকিত করা। শত প্রতিকূলতায়ও তিনি স্কুলটিকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। যেহেতু আমার জন্ম ’৫৭ সালে, সেহেতু একদম অবুঝ ছিলাম না, অল্প বিস্তর বুঝতাম। তাই আবছামতো হলেও কিছু মনে আছে। আমি ছোটবেলায় পাশেই ফুপুর বাড়িতে ছিলাম। গ্রামে কয়লার চুলোয় রান্না হতো। রান্না শেষে জমে থাকা চুলোর ছাই রান্নাঘরের পাশেই নিরাপদ দূরত্বে কোথাও জমা করে রাখা হতো হাড়ি-পাতিল ধোয়া ও অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য। আমি ঐ নরম ছাইয়ের মধ্যে থাকতে পছন্দ করতাম। ছাইয়ে আঙ্গুল ঢুকিয়ে এটা সেটা লিখতাম। আমি এক ধ্যানে নিমগ্ন চিত্তে এসব করার কারণে টেরও পেতাম না কে বা কারা আমাকে হাঁস-মুরগি ঢাকার খাঁচা দিয়ে ঢেকে রেখেছে। কিন্তু আমি এসব কর্ণপাত না করে নির্ভয়ে ওর মধ্যেই আপনমনে খেলাধুলো করতাম।

তিনি বলেন, আমার বাবা ছিলেন একজন সত্ ও দূরদর্শী মানুষ। একটু বুঝে ওঠার পর বাবার এসব সামাজিক সেবামূলক কাজ ও দূরদর্শীতা আমাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। আমার ধারণা, আমার অন্য ভাই-বোনরাও বাবার এসব আদর্শকে লালন করেই বড় হয়েছেন। শুধু আমার পরিবার নয়, গ্রামের সকলের কাছে বাবা ছিলেন আদর্শ। আমরা বাবাকে পরিপূর্ণ মূল্যায়ন করতে পেরেছি অনেক পরে। আমি ও আমার বড় ভাই যখন জাপানে পড়াশোনা করি, আমার ভাই যখন ভিজিটিং প্রফেসর, তখন সেই দেশের আদর্শবান মানুষগুলোর ত্যাগ দেখে আমার বাবার কথা মনে পড়ে যেতো। তখন আমরা দুই ভাই গল্প করতে করতে বলতাম—আসলে বাবার কনিষ্ঠ আঙ্গুলের সমতুল্যও আমরা নই।

শিল্পী মোস্তাফিজুল হক আরও বলেন, আমার বাবা অপব্যয় পছন্দ করতেন না, অনেকটা মিতব্যয়ী তথা সংযমী মানুষ ছিলেন। কিন্তু বাসায় প্রতিদিন প্রচুর মানুষ থাকতেন, তাদের জন্য ঠিকই আহারের ব্যবস্থা করতে হতো। আবার বাবা মিতব্যয়ী হলেও ভালো খেতে পছন্দ করতেন, রসনা বিলাসী ছিলেন। ফলে মা খাবারে কোনো কার্পণ্য করতেন না। তিনি ঠিকই সব ম্যানেজ করে নিতেন। আমার মা ছিলেন অনেকটা হাতখোলা; মায়ের কাছে কেউ কিছু চেয়ে তাকে খালি হাতে ফিরতে হতো না। এ ব্যাপারে মা গ্রামে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন; আমার বাবার চেয়েও। ফলে মায়ের মৃত্যুর পর গ্রামের লোকদের আফসোস করে বলতে শুনেছি— উনার মৃত্যুতে গ্রামের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। তাই আমি গর্ববোধ করি, মায়ের কাছ থেকে শিখেছি মানবিক দিকটা আর বাবার কাছ থেকে পেয়েছি একজন দক্ষ সংগঠকের দীক্ষা। আমার এসব বলার অন্যতম কারণ বা উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের সকলের উচিত মা ও বাবাকে অনুসরণ করা। কারণ আমার বিশ্বাস প্রত্যেক পিতা ও মাতার কাছে আমাদের শেখার মতো অনেক কিছু আছে। শুধু প্রয়োজন চোখ-কান খোলা রেখে তাদেরকে অনুসরণ বা অনুকরণ করা। পক্ষান্তরে অভিভাবকদের প্রতি আমার নিবেদন—আপনারা সবসময় সন্তানকে গল্পের ছলে নিজেদের জীবনের গল্প শোনান। ভালো কাজের পুরস্কার কী—সেগুলো বলুন। সন্তান দেখবেন এসবই একসময় গর্বের সঙ্গে অনুসরণ করবে, নিজ স্ত্রী-সন্তানদের বলবে। আর এভাবেই আমাদের নতুন প্রজন্ম জ্ঞান ও গুণে সমৃদ্ধ ও আলোকিত হবে।