একটি আদর্শ ক্লাসরুমে সাধারণত ৫০ জন শিশু শিক্ষার্থী থাকে। যেই ৫০ জন শিশু আজিকে হাসিয়া খেলিয়া বেড়াইল, আগামীকাল তাহারা সবাই পানিতে ডুবিয়া মারা গেল! হ্যাঁ! একই ক্লাসের সবাই এক দিনে একসঙ্গে পানিতে ডুবিয়া মরিতেছে না বটে; আলাদা জায়গায়, বিচ্ছিন্নভাবে মরিতেছে। সেই কারণে তাহাদের লইয়া সেইভাবে সংবাদও প্রকাশ হইতেছে না। অথচ সমস্যাটি ভয়াবহ! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দেবতার গ্রাস’ কবিতায় শিশু রাখালের মাসি নিতান্তই পরিহাসছলে বলিয়াছিলেন, ‘চল তোরে দিয়ে আসি সাগরের জলে!’ সাগরে ঝড় উঠিবার পর নৌকাডুবির উপক্রম হইলে ঝঞ্ঝা হইতে নিষ্কৃতির আশায় রাখালকে ছুড়িয়া ফেলিয়া দেওয়া হয় সাগরের জলে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে এই একবিংশ শতকেও রাখাল-শিশুদের মুক্তি নাই। শান্ত জলাশয়েই তাহারা আক্ষরিক অর্থে ডুবিয়া মারা যাইতেছে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, প্রতিদিন ৫০টি শিশু পানিতে ডুবিয়া মারা যাইতেছে। অর্থাত্ প্রতিদিন যেন একটি একটি করিয়া অর্ধশত শিশু-শিক্ষার্থীতে পূর্ণ ক্লাসরুমটি সম্পূর্ণ খালি হইয়া যাইতেছে।
দুঃখের সহিত বলিতে হয়, জরিপে দেখা গিয়াছে, জনসংখ্যার অনুপাতে বিশ্বে সবচাইতে অধিক শিশু পানিতে ডুবিয়া মারা যায় বাংলাদেশে। এমনকি রোগে ভুগিয়া মৃত্যুর চাইতেও বাংলাদেশে পানিতে ডুবিয়া মৃত্যুর হার অধিক। যেহেতু পানিতে ডুবিয়া কোনো শিশু মারা গেলেও তাহার কোনো রিপোর্ট হয় না, সেই জন্য পুলিশের খাতায়ও ইহাদের উল্লেখ থাকে না। আরো মর্মান্তিক বিষয় হইল, গ্রামাঞ্চলে সমবয়সি শিশুরা একত্রে খেলাধুলা করে, দৌড়ায় ও ঘুরিয়া বেড়ায়। একজন পানিতে পড়িয়া গেলে তাহাকে সাহায্য করিতে গিয়া অন্যরাও ডুবিয়া মরে। কিন্তু কেন এত অধিকসংখ্যক শিশু প্রতিদিন পানিতে ডুবিয়া মরে? গবেষণায় দেখা গিয়াছে, সমতল এই দেশটির চারিদিকে বিভিন্ন ধরনের প্রচুর জলাশয় তথা পুকুর, নদী, ডোবা, খাল, বিল রহিয়াছে। তবে ৮০ শতাংশ দুর্ঘটনা পুকুরেই ঘটে। যাহা বাড়ির সীমানা বা ঘরের ২০ মিটারের মধ্যে। মূল সমস্যাটি এইখানে এই সকল শিশুকে দেখভাল করিবার অভাব। তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হইল, ডুবিয়া মৃত্যুর ঘটনা ৬০ শতাংশ ঘটে সকাল ৯টা হইতে বেলা ১টার মধ্যে। কারণ এই সময় মায়েরা ব্যস্ত থাকেন। বাবারাও কাজে ঘরের বাহিরে এবং বড় ভাইবোন থাকিলে তাহারা যে যাহার মতো ব্যস্ত থাকে। দরিদ্র পরিবারে তুলনামূলক অধিক বাচ্চা থাকে বিধায় প্রতিটি বাচ্চাকে নজরে রাখা গরিব অভিভাবকের পক্ষে সকল সময় সম্ভব হয় না। অন্যদিকে, যেই সকল শিশু পানিতে ডুবিয়া যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাহারা তাত্ক্ষণিকভাবে কোনো প্রাথমিক চিকিত্সা পায় না। কারণ এই প্রাথমিক চিকিত্সার জ্ঞান গরিব-নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর জানা নাই। ফলে পানিতে ডুবিলে সেইখান হইতে তুলিয়া কী করিতে হইবে, সেই প্রাথমিক কাজটাই তাহারা জানে না। বিশেষ করিয়া হূিপণ্ড এবং শ্বাসপ্রশ্বাস চালুর গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক চেষ্টার দেখা মিলে না। তাহা ছাড়া কিছু কুসংস্কার রহিয়াছে, যেমন মাকে ধরিতে না-দেওয়া বা অনেক সময় শিশুকে মাথায় তুলিয়া চারিদিকে ঘুরানো—ইহাতে পানিতে ডুবিবার পর বাঁচিবার যেইটুকু আশা অবশিষ্ট থাকে, তাহাও নষ্ট হইয়া যায়।
উল্লিখিত সমস্যা বয়ানের মধ্যেই এই সমস্যার সমাধান রহিয়াছে। ইহার পাশাপাশি কমিউনিটিভিত্তিক সচেতনতা তৈরি করাও বিশেষ জরুরি। এইভাবে নীরবে শিশুমৃত্যু মানিয়া লওয়া যায় না।
