পিটিয়ে হত্যার সংস্কৃতি বন্ধ হোক

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২০, ২১:১১

শুধু সন্দেহের বশে, শুধু অন্যের কথা শুনে প্রভাবিত হয়ে মানুষ হত্যা করা যায়! অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও এর উত্তরে খুঁজতে গেলে আপনাকে হ্যাঁ শুনতে হবে। আমাদের চারপাশে, হয়তো আমাদের সঙ্গেই হাটবাজারে, রাস্তায়, দোকানে, উপাসনালয়ে ঘোরাফেরা করছে কত ছদ্মবেশী। এখন তো ভয় হয়, আমার পাশের লোকটিই ঘাতক কি না!

সম্প্রতি চলতি বছরের ২৯ অক্টোবর লালমনিরহাটের পাটগ্রামে জুয়েল নামক এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার পর তার মৃতদেহ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় শত শত মানুষ। জুয়েল নামক ঐ ব্যক্তি ধর্ম অবমাননা করেছেন, এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে বহু মানুষ জড়ো হয়ে তাকে পিটিয়ে হত্যা করেন। পিটিয়ে হত্যা এবং রক্তাক্ত দেহ আগুন দিয়ে পোড়ানোর ভিডিও ভাইরাল হয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। এর আগে গত বছরের ২০ জুলাই রাজধানীর উত্তর বাড্ডার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ছেলেধরা সন্দেহে তাসলিমা বেগম রেনু নামক একজনকে পিটিয়ে হত্যা করে উপস্থিত কয়েক জন। অথচ নিজের চার বছরের কন্যাশিশুকে স্কুলে ভর্তি করানোর তথ্য সংগ্রহে গিয়েছিলেন তিনি। গত বছর পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা প্রয়োজন হওয়ার গুজবকে কেন্দ্র করে হঠাত্ই বেড়ে যায় গণপিটুনির ঘটনা যদিও এই গণপিটুনির ঘটনা নতুন নয়।

২০১১ সালের ১৭ জুলাই সাভারের আমিন বাজারের বড়দেশী এলাকায় ছয় শিক্ষার্থীকে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতরা সবাই ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। শুধু নিহতদের বন্ধু আল আমিন নামে এক শিক্ষার্থী আলোচিত ঐ ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যান।

কিন্তু কেন ঘটছে এমন ঘটনা? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য, মানসিক অস্থিরতা এবং মাদকাসক্তিসহ নানা কারণ। এসবের জন্য যে মোটিভেশন প্রয়োজন, তা না থাকায় সমাজের বিভিন্ন স্তরে মানুষ হতাশায় ভোগেন, পরিবেশ হয়ে ওঠে অস্থিতিশীল, যার কারণে ঘটছে এমন সহিংস ঘটনা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক একটি জাতীয় দৈনিককে বলেন, ‘সামাজিক অস্থিরতা, বিচারহীনতা, গুজব, উগ্রতা, সুশিক্ষার অভাবে গণপিটুনিতে হত্যার মতো নির্মম ঘটনা ঘটছে। দুষ্কৃতকারীরাও অশুভ উদ্দেশ্য হাসিল করতে এমন ঘটনা ঘটায়। কিন্তু কোনো মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। প্রত্যেক মানুষেরই বাঁচার অধিকার রয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় যারা জড়িত তারা অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে।’

কেন শুধু সন্দেহের বশে হত্যা করা হচ্ছে মানুষকে। মানুষ না বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী! তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে না রয়েছে বিবেক নামক বড় আদালত! কিন্তু তা কেন কাজে লাগানো হচ্ছে না? চিলে কান নিয়েছে শোনার পরই চিলের পেছনে ছুটতে হবে! আগে তো হাত দিয়ে দেখা উচিত কান আছে কি নেই?

বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গণপিটুনিতে দেশে প্রায় ৮০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যেগুলোর কোনোটায় ছেলেধরা বা ডাকাত সন্দেহে আবার কোনো কোনো ঘটনায় সামান্য চোর সন্দেহেও পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটেছে।

প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো এলাকায় ঘটছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা। কিন্তু এজন্য কি আইন নিজের হাতে তুলে নিতে হবে? দেশের প্রচলিত বিচারব্যবস্থার কি কোনোই দরকার নেই! আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তো সব থানায়ই রয়েছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যদি বেশি নাজুক বা সংঘাত বেশি হয়, সেসব স্থানে বাড়তি পুলিশ ফাঁড়িও স্থাপন করা হয়। কিন্তু কোনো সমস্যা দেখলে নিকটস্থ থানায় বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর আগেই কেন মানুষ গণপিটুনি শুরু করে! অপরাধের শাস্তির জন্য তো আদালত-বিচারব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু কিছু মানুষ ছোট ঘটনায়ও পিটিয়ে মানুষ হত্যার মতো যে ঘটনা ঘটাচ্ছে, তা এক ধরনের বিকারগ্রস্ততা বৈ কিছু নয়?

দেশ, সমাজ ও তার নাগরিকদের সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে হলে জাগ্রত করতে হবে নৈতিকতাবোধ। প্রয়োজন মূল্যবোধ, প্রয়োজন আত্মসংযম। তবেই ভাইয়ের হাতে নিরাপদ থাকবে ভাই, নিরাপদে পথ চলবে বোন। বিশ্ব দেখবে সৌহার্দপূর্ণ একটি বাংলাদেশ।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা