বিদ্যুত্সংকটে সিলেটে দুঃসহ নগরজীবন

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২০, ২২:২২

সিলেট বিভাগীয় নগরীর অনেক জায়গায় বিদ্যুত্ সরবারাহ বন্ধ থাকায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সিলেটের জনজীবন। স্থবির হয়ে আছে ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক-বিমা, অফিস-আদালত। গত মঙ্গলবার থেকেই নগরীর ২৭টি ওয়ার্ডে বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার চলছে। এদিকে দীর্ঘ সাড়ে ৩১ ঘণ্টা পর বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় কিছু এলাকায় বিদ্যুত্ সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিদ্যুত্ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে সব এলাকায় বিদ্যুত্ সরবরাহ শুরু হবে। এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জ জেলাসহ কিছু কিছু এলাকায় বিকল্প পন্থায় বিদ্যুতের সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হয়।

প্রকৌশলীরা জানান, অবস্থার উন্নয়নে মঙ্গলবার রাত থেকে ৪০০ লোক সেখানে কাজ করছেন। বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক (জনসংযোগ) সাইফুল হাসান চৌধুরী জানান, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ এক-চতুর্থাংশ এলাকায় বিদ্যুত্ এসেছে। পর্যায়ক্রমে বাকি এলাকায় বিদ্যুতের সংযোগ প্রদান করা হবে। তবে নগরীর অনেক এলাকার বসিন্দারা জানান, তারা এখানো নিঝুম অন্ধকারে।

এদিকে নগরীর ৮ লক্ষাধিক লোক পড়েছে মহাবিপাকে। ২৭টি ওয়ার্ডে চলছে পানির জন্য হাহাকার। কলসি, বালতি, প্লাস্টিকের জার নিয়ে এদিক-ওদিক ছুটতে দেখা যায় গতকাল সারা দিন। নগরীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করতে দেখা যায়। কেউ কেউ ভ্যানগাড়িতে করে পানি সংগ্রহ করছে। মানুষের পান করা পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বাজারের বোতলজাত পানিও ফুরিয়ে গেছে অনেক জায়গায়। অনেক গৃহিণী জানান, বাথরুমে পানি নেই। এমনকি খাওয়ার প্লেট ধোয়ারও কায়দা নেই।

অন্ধকার দূর করতে অনেক জায়গায় মোমবাতিই এখন প্রধান ভরসা। এই সুযোগে বেড়ে গেছে মোমবাতির দামও। কোথাও কোথাও ৫ টাকার মোমবাতি বিক্রি হচ্ছে ১২ টাকায়। নগরীর অনেক ফিলিং স্টেশন বন্ধ। যানবাহনে জ্বালানির সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতাল-ক্লিনিকে চরম দুরবস্থা চলছে। বিদ্যুতের অভাবে মোবাইল, ইন্টারনেটের যোগাযোগব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলেন, বিদ্যুত্ না থাকায় ক্রেতা নেই। একনাগাড়ে জেনারেটর চালিয়ে ইন্টারনেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও সেবা দিতে পারছে না।

সিটি করপোরেশনের পানি সরবরাহ শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী আলী আকবর বলেন, বিদ্যুেকন্দ্রে আগুন লাগার আগে প্রায় ১ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হয়। কিন্তু বিদ্যুত্ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে সঠিকভাবে পানি সরবরাহ সম্ভব নয়। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে নগরে মাইকিং করা হয়েছে।

দুপুরের দিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পল্লী বিদ্যুত্ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সন্ধ্যার মধ্যে একটি পাওয়ার ট্রান্সফরমার দিয়ে বিদ্যুত্ সরবরাহ আংশিক চালু করা সম্ভব হতে পারে। আর অন্য একটি ট্রান্সফরমার গাজীপুরের টঙ্গী থেকে ট্রাকে করে পাঠানো হচ্ছে। সেটি এসে পৌঁছালে তা স্থাপন করতে দুই-এক দিন সময় লাগবে। এরপর পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে সিলেটের বিদ্যুত্ব্যবস্থা।

সিলেট পল্লী বিদ্যুত্ উন্নয়ন ও বিতরণ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মোকাম্মেল হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার গ্রাহক আছেন। বিদ্যুত্ব্যবস্থার বিপর্যয় হওয়ায় ৩ লক্ষাধিক গ্রাহক দুর্ভোগে পড়েছেন। বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছি। গ্রিডের লোকজনও অবিরাম কাজ করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, এই অগ্নিকাণ্ডে ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি)-এর নিয়ন্ত্রণাধীন গ্রিড লাইন সিলেট কুমারগাঁও ১২০ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্রে মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে বিদ্যুত্ সরবরাহব্যবস্থা ব্যহত হয়। ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিটের এক ঘণ্টা চেষ্টায় দুপুর সোয়া ১২টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

তদন্ত কমিটি :বিদ্যুত্ সরবরাহ উপকেন্দ্রে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় মঙ্গলবার বিকালে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড অব কোম্পানি। সিলেট পল্লী বিদ্যুত্ উন্নয়ন ও বিতরণ বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলীকে আহ্বায়ক করে এ তদন্ত কমটি গঠন করা হয়। কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে নির্বাহী পরিচালক (ওঅ্যান্ডএম) পিজিসিবি বরাবর প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। আগুন লাগার ঘটনার পর পিজিসিবির প্রধান প্রকৌশলী ইকবাল আজমের নেতৃত্বে চার সদস্যের আরো একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরে বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্তি সচিব রহমত উল্লাহর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের এবং  বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের পাওয়ার জেনারেশনের প্রকৌশলী জাকির হোসেনের নেতৃত্বে চার সদস্যের তৃতীয় কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা তদন্তকাজ শুরু করেছেন। কোনো কোনো কমিটি গতকাল বিকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।