সরকারের বন্ড সুবিধার আওতায় থাকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্ধেকের বেশিই এখন নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। ঢাকার কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এই অফিসের অধীনে বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬ হাজার ৬৭৯। এর মধ্যে বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে ৩ হাজার ৩৭টি প্রতিষ্ঠান। বাকি ৩ হাজার ৬৪২টি প্রতিষ্ঠান নিষ্ক্রিয়। সূত্র জানায়, নিষ্ক্রিয় তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৬১৬টি ঠিকানা অনুযায়ী খুঁজে পাননি কর্মকর্তারা। সব মিলিয়ে ৯ শতাধিক কারখানার কোনো অস্তিত্বই নেই। বাদবাকি প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন অপরাধ কিংবা অভিযোগে লাইসেন্স স্থগিত, বাতিল, ব্যাংক হিসাব জব্দ করার কারণে নিষ্ক্রিয় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সক্রিয় থাকা কারখানাগুলোর মধ্যেও বেশ কিছু কারখানা আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের সঙ্গে নেই। নানা কায়দায় এসব কারখানার আমদানি-রপ্তানির নামে এ খাতে অনিয়ম হয়। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার কারণে ব্যাক টু ব্যাক এলসির (রপ্তানির অনুকূলে ঋণপত্রের বিপরীতে ব্যাংক থেকে ঋণপত্র) জন্যও বন্ড লাইসেন্স নেওয়ার বাধ্যবাধকতা দেওয়ায় অনেককে বাধ্য হয়ে লাইসেন্স নিতে হয়েছে। তারা সঠিক নিয়ম মেনে নিরীক্ষা বা অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন না করায় তাদেরও অনেকের ব্যবসা নিষ্ক্রিয় করে রেখেছে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট অফিস।
এত বছরেও বন্ডের তালিকায় থাকার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অবশ্য ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার মো. শওকাত হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, এ অফিসের অধীনে থাকা সব প্রতিষ্ঠানের ফাইল পুনঃপরীক্ষা করা হচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসায় নেই, সেগুলো পরীক্ষা করে বন্ধ করা হবে। গত প্রায় এক মাসে পরীক্ষা করে এ ধরনের ১৫টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যবসায় না থাকা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি কেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের পাওনা রয়ে গেছে। পাওনা আদায় ইস্যুটির সমাধান না করে তা বন্ধ করা যায় না।
নিষ্ক্রিয় বন্ড লাইসেন্সের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরাসরি রপ্তানিকারক শিল্প ২ হাজার ৭২০টি। এছাড়া প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক ৮১৯টি, রপ্তানি পক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) থাকা ১৭টি, সুপারভাইজড বন্ড ৪৬টি, হোম কনজাম্পশন বন্ড ৩৭টি, ডিপ্লোম্যাটিক বন্ড একটি ও ডিউটি ফ্রি শপ দুটি।
অবশ্য ব্যবসায়ে না থাকা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে এই খাতে শৃঙ্খলা আনার পক্ষে প্রকৃত রপ্তানিকারকেরা। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ইত্তেফাককে বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ে নেই, সেগুলোর লাইসেন্স বাতিল করা উচিত। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য এনে বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। বিষয়টি আমরা বন্ড কমিশনারেট অফিসকেও বলেছি। তবে যারা প্রকৃত ব্যবসায়ী, কিন্তু সঠিক সময়ে হয়তো নিরীক্ষা করতে পারেনি, তাদের ব্যবসা বন্ধ করা ঠিক হবে না।’
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) দীর্ঘদিন ধরে বন্ড অটোমেশন কার্যক্রম নিয়ে কথা বলে আসছে। এ প্রতিষ্ঠানের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বর্তমানে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, একদিকে অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠান নিষ্ক্রিয়; অন্যদিকে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স নিতে সমস্যা হচ্ছে। এর সুবিধা নিচ্ছে অপব্যবহারকারীরা।
এ লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একটি প্রকল্প গত তিন বছর ধরে চলমান থাকলেও তাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ড. এম মাশরুর রিয়াজ মনে করেন, এটি বাস্তবায়ন হতে ছয় মাসের বেশি সময় লাগার কথা নয়। এ কারণে সার্বিক বন্ড ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা যাচ্ছে না।
