রংপুরে এক যুগ ধরে ঝুলে আছে হাজারের বেশি ধর্ষণ মামলা

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২০, ২২:৩০

রংপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন তিনটি আদালতে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিচারের অপেক্ষায় ঝুলে আছে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা প্রায় ১ হাজার মামলা। এ কারণে বিচারপ্রার্থী নারী ও শিশু এবং তাদের পরিবারের দিন কাটছে নানা যন্ত্রণায়। এই পাশবিক বর্বরতার স্মৃতি তারা কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছে না। তারা হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছে সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে। অনেক ক্ষেত্রে নষ্ট হচ্ছে অর্থনৈতিকভাব স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ। পাশাপাশি তারা ধর্ষক ও তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে কখনো হুমকি, কখনো প্রকাশ্যে অপমানের শিকার হচ্ছে। এর পরও সুবিচারের আশায় তারা দিনের পর দিন আদালতে ঘোরাঘুরি করলেও নানা দীর্ঘসূত্রতার কারণে সহজে রায় পাচ্ছে না।

জানা গেছে, রংপুরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত রয়েছে তিনটি। এই তিন আদালতে ১২ থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত সময় ধরে প্রায় ১ হাজার ধর্ষণের মামলা বিচারের অপেক্ষায় ঝুলে আছে। গত দুই সপ্তাহে তিনটি মামলায় আসামিদের যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। ঐ তিন মামলা ১৫ থেকে ১৬ বছর আগে দায়ের করা। সম্প্রতি সংশোধনের আগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা নিষ্পত্তির নির্ধারিত সময় বেঁধে দেওয়া থাকলেও শেষ না হলে কী হবে তার উল্লেখ না থাকায় এই সুযোগের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেন আইনজীবীরা। ফলে দফায় দফায় মামলার তারিখ পিছিয়ে যায়। মামলার প্রমাণাদি দুর্বল হতে থাকে এবং সাক্ষী হাজিরে যথেষ্ট সময়ক্ষেপণের সুযোগ পান আইনজীবীরা। অনেক সময় সাক্ষী আসতেও চান না। এতে বছরের পর বছর এ মামলাগুলো প্রলম্বিত হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুলিশের যথাযথ সহযোগিতা না পাওয়া, বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা, বিচারকের সংকট ইত্যাদি কারণও মামলা ঝুলে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। এমনকি একসময় বাদী নিজেও হতাশ হয়ে পড়েন।               রংপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট খন্দকার রফিক হাসনাইন স্বীকার করেন, তার আদালতে প্রায় ৩০০ ধর্ষণের মামলা বিচারের অপেক্ষায় আছে। এর বেশির ভাগই ১২ থেকে ১৫ বছর ধরে ঝুলে আছে। এর পেছনে প্রধান চারটি কারণ চিহ্নিত করেন তিনি। সরকারি এই আইনজীবীর বিবেচনায় এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে মামলার সংখ্যাধিক্য ও বিচারকের সংকট। এ কারণে একটি মামলায় বছরে দুই থেকে তিনটির বেশি শুনানির তারিখ পড়ে না। ফলে বছর পার হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, মামলার বাদী ও সাক্ষীরা আদালতে সময়মতো সাক্ষ্য দিতে আসেন না। তৃতীয়ত, সাক্ষীদের আদালতে হাজির করার ক্ষেত্রে পুলিশের ব্যর্থতা। চতুর্থত, আসামিপক্ষ নানান অজুহাতে মামলার বিচার শেষ করতে বিলম্ব করে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসেন তুহিনও স্বীকার করেন তাদের আদালতে তিন শতাধিক মামলা বিচারাধীন আছে। এর মধ্যে কিছু মামলা ঝুলে আছে ১২ থেকে ১৭ বছর ধরে।

অন্যদিকে বিশিষ্ট আইনজীবী ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রাজু নারী ও শিশু নির্যাতন মামলাগুলোর বিচার বিলম্বিত হওয়ার জন্য পাবলিক প্রসিকিউটরদের (পিপি) দায়ী করেন। তিনি বলেন, মামলা নিষ্পত্তির ব্যাপারে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আইন অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বাধ্যবাধকতা মানছেন না কেউই। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এসব মামলার বিচারকাজ শেষ করতে একাধিক আদালত স্থাপনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। এ ব্যাপারে রংপুর আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মালেক সাংবাদিকদের জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে ঝুলে থাকা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এখন থেকে আর কোনো মামলা ঝুলে থাকবে না।