ফল

প্রিকলিপিয়ার

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২০, ১৯:৫৮

কাজের সুবাদে বেশ কয়েক বছর মেক্সিকোতে ছিলাম। মেক্সিকো সিটি থেকে মাত্র আশি কিলোমিটার দূরে উঁচু পাহাড়ের উপত্যকাজুড়ে আরেকটি সুন্দর শহর, নাম কুয়ার্নাভাকা। বছরজুড়ে চমত্কার আবহাওয়ার জন্য এই শহরকে বলা হয় ‘চির বসন্তের শহর’। দোকানে কমলা, আম, আনারস, পেয়ারা, পেঁপের ছড়াছড়ি। আমি বহু যোজন দূরে ভিনদেশে বসে দেশের ঘ্রাণ পাই। রাস্তার ধারেও ফলের সঙ্গে ফলের রস বিক্রি করেন অনেকে। অনেকটাই আমাদের ঢাকা শহরের মতো। তবে ভিড় কম, রাস্তা বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। শহরটি গাছপালাময়,  দেখে মনে হবে জঙ্গলের মাঝে এক রূপকথার নগরী!   

ফলের দোকানগুলোতে অ্যাভোকাডোর বিপুল সমাহার ছাড়িয়ে আরেকটি ফল চোখে পড়ে, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলে ‘টুনা’, পুষ্টিগুণে ভরপুর খুব মিষ্টি এবং রসালো। ক্যাকটাসের ফল। মেক্সিকানরা প্রতিবেলা খাবারের সঙ্গে এই ফলের রসে পানি মিশিয়ে ‘অ্যাগুয়া দ্য টুনা’ বা টুনার শরবত পরম তৃপ্তিতে পান করেন। পানি মেশানোর ফলে হালকা মিষ্টির সঙ্গে চমত্কার মৃদু ঘ্রাণ পাওয়া যায়, রুচি বাড়ায়। মেক্সিকোর খাদ্যসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এই ক্যাকটাসের ফল। মেক্সিকোর জাতীয় পতাকায় উত্কীর্ণ রয়েছে এই প্রতীকী উদ্ভিদ। ইংরেজিতে বলা হয় প্রিকলিপিয়ার ক্যাকটাস। বাংলায় ফণিমনসা বলা হলেও উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা ক্যাকটাসি পরিবারের ‘ওপানশিয়া’ গণের এই উদ্ভিদের নাম দিয়েছেন ‘ফাইকাস-ইন্ডিকা’। প্রায় তিন মিটার উঁচু ওপানশিয়ার রয়েছে প্রায় ২০০ প্রজাতি। এর উজ্জ্বল, লাল, সবুজ, গোলাপি, হলুদ রঙের ফল রসালো এবং মিষ্টি। মরুভূমিতে যেখানে পানি খুবই কম, সেখানে এই রসালো ফল এবং সরস কাণ্ড মানুষ ও কিছু পশুপাখির খাবার এবং পানির চাহিদা অনেকটা পূরণ করে।

দক্ষিণ এবং উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ মরু অঞ্চলে অযত্নে বেড়ে ওঠে এই ক্যাকটাস। প্রচলিত আছে, আমেরিকার মরুভূমি থেকে উদ্ভিদটি সংগ্রহ করেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস এবং ইউরোপ ফেরার সময় সঙ্গে করে নিয়ে আসেন তিনি। বর্তমানে আফ্রিকা এবং ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় শুষ্ক অঞ্চলে এটি প্রচুর দেখতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে গারো, খাসিয়া ইত্যাদি অঞ্চলে এই গাছ ফণীনাগ, রাজমণি ইত্যাদি নামে পরিচিত।

প্রিকলিপিয়ার এক ধরনের ক্যাকটাসের ফল। এ ফল থেকে জ্যাম-জেলি ও পানীয় তৈরি হয়। এটির সরস কাণ্ড একটি উত্কৃষ্ট খাদ্য। মেক্সিকোনরা নানারকম খাবার তৈরি করে থাকেন এই কাণ্ড থেকে। এই মজার ফলটি হূদয়বান্ধব! শুধু হূদপিণ্ড নয়, কিডনি ও ফুসফুসের জন্য অনেক ভালো এই কম ক্যালোরির ফলটি। পর্যাপ্ত, আঁশ (ফাইবার), ভিটামিন সি সেইসঙ্গে ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, তামা এবং ক্যালসিয়ামের মতো স্বাস্থ্যকর খনিজ থাকে। প্রিকলিপিয়ার ফলে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আছে, যা আমাদের শরীরের কোষগুলোকে সুরক্ষা দেয়। চেহারায় রূপ-লাবণ্য ধরে রাখে। রক্তে চিনি (ট্রাইগ্লিসারাইড) এবং খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস করতে সহায়তা করে। আমাদের শরীরের যাবতীয় বিপাকীয় কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য এসব খনিজ এবং ইলেক্ট্রোলাইটের ভূমিকা অপরিসীম। ভিটামিন ই ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। ভিটামিন বি রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে সহায়তা করে। অ্যাজমা বা হাঁপানি থেকে রেহাই পেতেও সাহায্য করে মরুভূমির এই ফল। ফলটিতে ছোট ছোট অনেক কালো বিচি থাকে। অনেকেই তাই খানিকটা বিরক্তবোধ করেন। বিচি ছাড়িয়ে রস করে অনেকে তা পান করেন। তবে বিচিসহ খেতে পারলে তা খাবার হজমে সাহায্য করে। আর খাবার ভালো হজম হলে অনেক রোগ থেকে দূরে থাকা যায়। পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার আছে বলেই অন্ত্রে খাদ্য চলাচল নির্বিঘ্ন করে। এজন্য বিটালাইন (ভিটামিন বি-এর যৌগ) এবং পটাসিয়ামকে ধন্যবাদ দেওয়া যেতে পারে। পটাসিয়াম খাবারকে আরো ভালোভাবে আত্তীকরণে সহায়তা করে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম। এদিকে প্রদাহ নিরসনে বিটালাইন চমত্কার কাজ করে এবং হজমশক্তি বাড়ায়। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে পাকযন্ত্রকে সুরক্ষা দেয়। যারা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে কিংবা অতিরিক্ত ওজন সমস্যায় ভুগছেন, তাঁরা এ ফলটি খেতে পারেন। কেননা প্রতি ১০০ গ্রাম ফলে মাত্র ৪১ ক্যালোরি থাকে।