শিশু নির্যাতন বন্ধে অনলাইন সচেতনতামূলক অ্যাপ বানানোর জন্য স্বীকৃতি পেয়েছে নড়াইলের কৃতী সন্তান সাদাত রহমান। বাংলাদেশের ১৭ বছর বয়সি সাদাত রহমান সাইবার বুলিং ও অনলাইন ক্রাইমের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত পদক্ষেপ নিয়েছিল। এজন্য তাকে আন্তর্জাতিক এ সম্মানজনক পদকে ভূষিত করা হয়েছে। নেদারল্যান্ড ভিত্তিক শিশু অধিকার ফাউন্ডেশন এ পুরস্কারটি প্রদান করছে। করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে পুরস্কার পর্বটি অনলাইনে দেয় কর্তৃপক্ষ। নোবেল পুরস্কার হচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার। সুইডেনের বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে প্রতি বছর ছয়টি ক্যাটাগরিতে বিশ্বসেরাদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়। পুরস্কার বিজয়ীদের বলা হয় ‘নোবেল লরিয়েট’। ১৯০১ সালে এটি প্রবর্তিত হয়। তখন থেকে প্রতি বছর সারা পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সফল এবং অনন্যসাধারণ গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিত্সা শাস্ত্র, অর্থনীতি, সাহিত্য ও শান্তি মোট ছয়টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেওয়া হয়। ১৭ বছর বয়সি সাদাত রহমান একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে সাইবার বুলিং বা অনলাইনে হুমকি ও হয়রানিমূলক আচরণ সম্পর্কে তরুণদের শেখানো হয়। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে বাংলাদেশে ১৫ বছরের এক কিশোরীর আত্মহত্যা ঘটনা জানতে পেরে এই অ্যাপ বানাতে অনুপ্রাণিত হন তিনি। সাদাত রহমানের জেলার প্রায় ১ হাজার ৮০০ কিশোর এখন অ্যাপটি ব্যবহার করছে বলে জানা যায়। নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই সাদাত রহমানকে তরুণদের জন্য ‘অনুপ্রেরণা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ‘সাদাত একজন সত্যিকারের চেইঞ্জমেকার। তিনি সারা বিশ্বের তরুণ-তরুণীদের সাইবার বুলিং বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং আশেপাশের যেসব মানুষ মানসিক নির্যাতন ও আবেগের সমস্যায় ভুগছেন তাদের সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছেন,’ এক অনলাইন বক্তৃতায় মালালা ইউসুফজাই এ কথা বলেন।
জাতিসংঘের সাম্প্র্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বে প্রতি তিনটি তরুণ-তরুণীর মধ্যে একজন সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। সাইবার বুলিংয়ের কারণে উদ্বেগ, বিষণ্নতার মতো মানসিক সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদে নিদ্রাহীনতা, নিজের ক্ষতি করা বা এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সম্মানজনক এই পুরস্কার পাওয়ার পর সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছেন সাদাত রহমান। সাদাত রহমান বলেন, ‘আমি একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করি এবং আমি খুবই সাধারণ একটি ছেলে। আমি যদি সাইবার বুলিং থেকে কিশোর-কিশোরীদের রক্ষা করতে পারি, তাহলে অন্যরা কেন পারবে না?’ এই অর্জনে সাদাতকে অভিনন্দন জানিয়ে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছেন নড়াইলের আরেক কৃতী সন্তান বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মুর্তজা। সাদাতকে নিয়ে কিডস রাইটস লিখেছে, বাবা পোস্ট মাস্টার হওয়ায় এই কিশোর শৈশবেই বাংলাদেশের অনেক জায়গা ঘুরেছেন। এটা তার জন্য কষ্টকর হলেও প্রতিটি জায়গায় তিনি নতুন কিছু শিখেছেন এবং নতুন নতুন বন্ধু তৈরি করেছেন। ইন্টারনেটে অভ্যস্ত হয়ে তিনি ভিডিও নির্মাণ ও ওয়েবসাইট তৈরিতে মনোযোগী হন। এই সময়ে তার যে অনলাইন দক্ষতা তৈরি হয় তা পরে কাজে লাগে। এখন তিনি নিজের গড়ে তোলা সংগঠন ‘নড়াইল ভলান্টিয়ার্স’ এবং সাইবার বুলিংবিরোধী অ্যাপ ‘সাইবার টিনসের’ মাধ্যমে অন্যান্য শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সহায়তায় ঐ দক্ষতা কাজে লাগান। সাদাত সম্পর্কে কিডস রাইটসের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সাদাত একজন ‘তরুণ চেঞ্জমেকার’ ও সমাজ সংস্কারক। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে এক কিশোরীর (১৫) আত্মহত্যার পর কাজে নামে সাদাত।
২০১৭ সালে যখন মিয়ানমারে দমন-পীড়নের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছিল, সে সময় তরুণদের একত্রিত হওয়ার শক্তি বুঝতে পারেন সাদাত। তখন শান্তির আহ্বান জানিয়ে একটি সাইকেল র্যালি করেন সাদাত ও তার বন্ধুরা। পরে এই অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘নড়াইল ভলান্টিয়ার্স’ নামের সংগঠন গড়ে তোলেন তিনি। শিশু-কিশোরদের এই গ্রুপ শিশু অধিকারের নানা বিষয় নিয়ে কাজ করে। বাংলাদেশে সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে প্রধান বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে—শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা এর বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ বা বাবা-মাকে বলতে ভয় পেয়ে থাকে। এই অ্যাপ তাদের নিরাপদ ইন্টারনেটের ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি গোপনীয়তার সঙ্গে সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সুযোগ করে দেয়। এদিকে সংগঠনের মাধ্যমে সাইবার বিশেষজ্ঞ, সোশ্যাল ওয়ার্কার ও পুলিশকে এক জায়গায় নিয়ে আসেন সাদাত।
সাইবার টিনসের অ্যাপের মাধ্যমে এরইমধ্যে সাইবার বুলিংয়ের শিকার ৩০০-এর বেশি মানুষ উপকৃত হয়েছেন। ভুয়া সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে রিপোর্ট করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদানসহ নানাভাবে এই সহায়তা করা হয়েছে। এই অ্যাপের কল্যাণে সাইবার অপরাধের জন্য আট জনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে ইন্টারনেট সেইফটি নিয়ে সেমিনারের মাধ্যমে সাদাত ৪৫ হাজারের বেশি শিশু ও কিশোর-কিশোরীর কাছে তার বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। নিজের এলাকার প্রতিটি স্কুলে ‘সাইবার ক্লাবস’ তৈরি করেছেন তিনি। এসব ক্লাবে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ইন্টারনেট সম্পর্কে জানার সুযোগ দেওয়া হয়। এখন নিজের লোকালয় ছাড়িয়ে বাংলাদেশ জুড়ে সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তার অ্যাপকে কাজে লাগাতে চান সাদাত। বাংলাদেশ তার এই বিজয়ে গর্বিত ও আনন্দিত। তার এগিয়ে যাওয়ার পথকে আরো মসৃণ করতে সরকার তথা দেশবাসী সদা প্রস্তুত।
n লেখক :ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
