‘যত অন্ধকার, তত এরা ভালো দেখে’ সিঁধেল চোর সম্পর্কে ‘নিশিকুটুম্ব’ উপন্যাসে মনোজ বসুর এই ভাষ্য বেজায় কৌতূহলোদ্দীপক। আলো ছাড়া কীভাবে ‘ভালো’ দেখা যায়? চুরিবিদ্যা কীভাবে বড়বিদ্যা তার বিশদ বর্ণনা শেষে লেখক বলেন, ‘এ হলো জাত কারিগরের কাজ।’ এই ‘জাত’ কথার বিস্তৃত প্রয়োগের সাক্ষী আজ বাংলাদেশ, ক্ষেত্রও আজ বাংলাদেশ।
মাটির ঘর প্রায় অবসিত, চারদিকে পাকা দরদালান। বিদ্যুতের আলোয় জেগে থাকে রাত। ফলে সিঁধকাঠি অর্থাত্ শাবল-খুন্তি ইত্যাদি দিয়ে মাটির কাঁচাবাড়ি বা দেওয়ালে গর্ত-সুড়ঙ্গ করে ঘরে ঢুকে চুরি করার দিন শেষ। নিজেদের পেশা ঝুঁকির মুখে পড়ায় মাথায় হাত সিঁধেল চোরদের। তবে দিন যেহেতু বদলেছে, প্রকৃতিরও যেহেতু শূন্যতা না-পছন্দ; এই বদলের দিনে ‘নিশিকুটুম্ব’ নয়, ‘দিবাকুটুম্ব’রা রাজত্ব বিছিয়েছে। এই নতুন জাত কারিগরদের বজ্জাতিই এখন বাস্তবতা। সিঁধেল শব্দের সঙ্গে যুক্ত থাকা ছ্যাঁচড়া বা ছিঁচকে ব্যাপারটিও প্রতিস্থাপিত হয়েছে রীতিমতো ‘রাজসিক’ বয়ানে। দিবাকুটুম্বরা তাদের কাজটি সারেন দিনে-দুপুরেই, রাতের জন্য তাদের অপেক্ষা করতে হয় না।
‘চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা, যদি না পড়ে ধরার প্রবাদতুল্য এই কথাটিও বদলে গেছে তাই। ‘চুরি করে পড়লে ধরা, কিছুই হয় না ছাড়া!’ তাও যে-সে চুরি নয়; দুই-চার-পাঁচ-দশ কোটি টাকার নয়ছয়ে তিলমাত্র জৌলুস নেই আর! আর কাঁহাতক এমন ম্যাড়মেড়ে চুরির খবরের পুনরাবৃত্তি! ‘পুকুরচুরি’ শব্দবন্ধটিও এখন সমান ক্লিশে। হাজার কোটি টাকার চুরি না হলে আবার কীসের চুরি! সংবাদমূল্য বলেও তো একটা ব্যাপার আছে, নাকি!
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত এক নম্বর অবস্থান থেকে যদিও বাংলাদেশ অনেকটাই সরে এসেছে, কিন্তু ‘বালিশকাণ্ড’, ‘পর্দাকাণ্ড’, ‘বইকাণ্ড’ ইত্যাকার যেসব ‘লঙ্কাকাণ্ড’ একের পর এক ঘটছে, তাতে যে-কারো মনে হতেই পারে ষড়্ঋতুর দেশে ‘চুরি’র অনুকূল আবহাওয়া বারো মাসই। শীতেও অসুবিধা নেই, গ্রীষ্মও সমান সুবিধা। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমে পোক্ত হচ্ছে লঙ্কাকাণ্ডের রাবণদের রাজত্ব। যত উন্নয়ন, তত এদের পোয়া বারো! ‘চুরি’ ও ‘উন্নয়ন’ যেন মাসতুতো ভাই; একে অপরকে ছাড়া তারা ল্যাংড়া-খোঁড়া!
অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে প্রকল্প শুরুর আগেই তার অস্বাভাবিক ব্যয় ধরার বিষয়টি সরকারপ্রধানেরও চোখে পড়ছে! বাংলাদেশ-চীন যৌথ উদ্যোগে রেললাইন নির্মাণের দুটি প্রকল্প থেকে মোট ৪ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা কমাতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ভাবলে গা শিউরে ওঠে, প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা!
প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ না হয় বাস্তবায়িত হবে, কিন্তু কেন এমনটা হলো? প্রকল্প দুটির ব্যয় নির্ধারণ, যাচাই-বাছাইসহ পুরো প্রক্রিয়ায় যারা জড়িত, তারা কি জবাবদিহির আওতায় আসবে? অতীত অভিজ্ঞতা এমন ভরসা জোগায় না।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় গত পাঁচ বছরে যারা গ্রেফতার হয়েছেন, তাদের ৯৭ ভাগেরও বেশি চুনোপুঁটি। সেই চুনোপুঁটিদের একজন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক আব্দুল খালেক বাদলেরই সম্পদের থই পাওয়া যায় না। কর্মচারী আবজাল হোসেনের সয়সম্পদের খতিয়ান দেখেও চক্ষু চড়কগাছ! রুই-কাতলাদের অবস্থা কতটা আজহাদা আলিশান হতে পারে, আন্দাজ করা যায়!
আর সাজাও যতটা যা হয় তাকে ‘লঘু’ বলাও কঠিন। ১৫০ কোটির বেশি টাকার গড়বড়ের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার পর ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সুধাংশু শেখর ভদ্রকে পাঠানো হলো বাধ্যতামূলক ছুটিতে। হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপিদের এক জনেরও কোমরে দড়ি পড়েছে বলে জানা যায় না। ফি বছর দেশ থেকে পাচার হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। খুব কমই জবাবদিহির মুখে পড়েছে।
আড়াই হাজার কোটি টাকা লোপাট করে পি কে হালদার কী অনায়াসে, নির্বিঘ্নে পেরিয়ে যান দেশের সীমানা! সাত বছরে আড়াই হাজার বিঘা জমির মালিক হন ফরিদপুরের দুই ভাই সাজ্জাদ হোসেন ওরফে বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান ওরফে রুবেল। আরেক সহোদর জুটি এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়ার কবজায় ১০ বছরে আসে ১২০টি বাড়ি-ফ্ল্যাট। টাকাপয়সা, সোনাদানা রাখেন তারা বস্তায় ভরে। ক্যাসিনো সম্রাটের সাম্রাজ্যে অর্থকড়ি যেন আক্ষরিক অর্থেই হাতের ময়লা। দুই-তিন মাসে কয়েক কোটি টাকা হোটেল বিল গোনা পাপিয়ার কাছে একেবারে জলভাত। স্বাস্থ্য খাতকে একাই রীতিমতো ফোঁপরা করে ছাড়েন মোতাজজেরুল ওরফে মিঠু এবং তিনিও পগার পার হন ঝুটঝামেলাহীনভাবে। রিজেন্ট হাসপাতালের কর্ণধার সাহেদ কত কামিয়েছেন, এখনো জানার বাকি। অবশ্য দিবাকুটুম্বদের যতটা যা ‘কীর্তি’ প্রকাশ্যে আসে, তাতে তাকে ‘চুরি’ বলায় একসঙ্গে দুই পক্ষকে ‘আহত’ করা। নিশিকুটুম্বরা পেটের দায়ে সিঁধ কেটে টাকাপয়সা, গয়নাগাতি, হাঁড়িকুড়ি হাতের কাছে যা পান তা নিয়েই চম্পট দেন, কিন্তু দিবাকুটুম্বরা রীতিমতো পুরো ঘরটাকেই হাপিস করে দেন! এ কোন ‘অন্ধকারে’ ছেঁয়েছে দেশ!
n লেখক :সাংবাদিক
