সশস্ত্র বাহিনী :আস্থায় অবিচল, শান্তিতে সমাদৃত

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২০, ২১:২৫

সশস্ত্র বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর। মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জনের মহান ব্রত নিয়ে যাত্রা শুরু করে আজ বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে যে জাতি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই যুদ্ধে রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনী গঠন, তাদের সংগঠিত করা, প্রশিক্ষণ প্রদান, যুদ্ধ পরিকল্পনা ও অভিযান পরিচালনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এই সশস্ত্র বাহিনী। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে সুসংগঠিত সশস্ত্র বাহিনী স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি দেশের নানা উন্নয়নমূলক অবকাঠামো বাস্তবায়নে অবদান রাখছে, দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে, বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের অধীনে শান্তিরক্ষা মিশনে অসামান্য অবদান রাখছে। সরকারও তাই স্বাধীনতা ও সার্বভৌত্বের প্রতীক সশস্ত্র বাহিনীকে যুগোপযোগী ও আধুনিক বাহিনী হিসেবে গঠনের লক্ষ্যে ভিশন-২০৩০ বাস্তবায়নের কাজ সময়ের সঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছে।

সশস্ত্র বাহিনী সরকারের বড় আস্থার জায়গা; যেখানে আস্থাহীনতা সেখানেই সশস্ত্র বাহিনীর ডাক। আর তাই দেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়নে চলমান বহু প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে সশস্ত্র বাহিনীর সরাসরি তত্ত্বাবধায়নে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক বাস্তবায়িত/চলমান প্রকল্পসমূহের মধ্যে: পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের নিরাপত্তা প্রদান, জাজিরা ও মাওয়া অ্যাপ্রোচ রোড এবং ব্রিজ অ্যান্ড ফ্যাসিলিটিজ সার্ভিস এরিয়ার কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে সুপারভিশন পরামর্শকের দায়িত্ব পালন। কুড়িল-পূর্বাচল লিংক রোডের উভয় পাশে ১০০ ফুট চওড়া খাল খনন। আলীকদম-থানচি এবং আলীকদম-জালানীপাড়া-করুকপাতা-পোয়ামুহুরী সড়ক নির্মাণ। ঢাকা-খুলনা (এন-৮) মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী ইন্টার সেকশন থেকে ইকুরিয়া-বাবুবাজার লিংক রোড সড়ক নির্মাণ। কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সাভার সেনানিবাস সংলগ্ন আন্ডারপাস নির্মাণ। জঙ্গি অপারেশন পরিচালনা। দেশের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন। হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং হাতিরঝিল প্রকল্পের নর্থ ইউলুপ নির্মাণ কাজে সহায়তা প্রদান। নোয়াখালীর স্বর্ণদ্বীপে মালটিপারপাস সাইক্লোন শেল্টার, মহিপাল ফ্লাইওভার নির্মাণ। জয়দেবপুর হতে ময়মনসিংহ পর্যন্ত ৮৭.১৮ কি.মি. সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মাওনা ফ্লাইওভার, সালনা রেল ওভার ব্রিজসহ প্রকল্পের মূল সড়ক নির্মাণ। ঢাকা বেড়িবাঁধ হতে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ। ষষ্ঠ বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সেতুর (মুক্তারপুর সেতু) সংযোগ সড়কে অবস্থিত দুটি ক্ষতিগ্রস্ত সেতুর বিকল্প (বাইপাস) সড়ক নির্মাণ ও সেতু দুটির সংস্কার/ পুনর্নির্মাণ। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে রুট অ্যালাইনমেন্টের মধ্যে বিদ্যমান ইউটিলিটি প্রতিস্থাপন/ অপসারণ প্রকল্পের জিপিআর সার্ভে, ডিটেইল সার্ভে, ইউটিলিটি শিফটিং ও ডেমুলিশন কাজ সম্পাদন।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী কর্তৃক বঙ্গোপসাগরে দিবা-রাত্রি টহল প্রদানের মাধ্যমে দেশের বিশাল সমুদ্র এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি সমুদ্র সম্পদ রক্ষা, চোরাচালান রোধ, উপকূলীয় এলাকার জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণসহ ব্লু-ইকোনমি উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করছে। দেশের রুপালি সম্পদ ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে জাটকাবিরোধী অপারেশন পরিচালনা করে। বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর ডুবুরি দল বঙ্গোপসাগর ও অভ্যন্তরীণ নদনদীতে বিভিন্ন উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। পাশাপাশি নৌবাহিনী সমুদ্রে দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজসমূহের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে সর্বদা সচল রাখছে এবং দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করছে। পায়রা সমুদ্রবন্দরের ড্রেজিং ও চ্যানেল ডিজাইন কার্যক্রমে হাইড্রোগ্রাফিক তথ্য উপাত্ত সরবরাহসহ ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা প্রদান এবং নোয়াখালীর হাতিয়া থানার ভাষানচর দ্বীপে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়স্থল নির্মাণ করে। আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ঘূর্ণিঝড় দুর্গত জনগণের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করে।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনী কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের বিভিন্ন অপারেশনাল জরুরি পরিবহন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারসমূহ নিয়মিত খাদ্য, রসদ ও জনবল পরিবহন ও মেডিক্যাল ইভ্যাকুয়েশনের কাজ পরিচালনা করা এবং সামরিক ও অসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণের পরিদর্শন কার্যক্রমে সহায়তা প্রদান। দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সামরিক ও অসামরিক স্থাপনাসমূহ এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের (Exclusive Economic Zone) আকাশসীমা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, সমুদ্রসীমায় অবৈধ অনুপ্রবেশ, মত্স্য সম্পদ রক্ষা ও চোরাচালান বিরোধী নানাবিধ উদ্ধার অভিযানসহ যে কোনো প্রয়োজনে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে সহায়তা প্রদান করে। দেশ-বিদেশে সংঘটিত ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস, সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ত্রাণসহায়তা প্রদান করে, দেশের যে কোনো দুর্যোগময় মুহূর্ত মোকাবিলায় দৈনন্দিন কার্যক্রমের সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা উদ্ধার ও অনুসন্ধানের জন্য বিভিন্ন বিমানঘাঁটিতে হেলিকপ্টার প্রস্তুত থাকে।

দেশের উন্নয়নে ও দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বে শান্তি স্থাপনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী অত্যন্ত সুপরিচিত ও সমাদৃত। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন কার্যক্রমে বাংলাদেশ Troops Contributing দেশ হিসেবে পরপর কয়েক বছর ১ম স্থানে ছিল এবং এই বছর পুনরায় ১ম স্থানে উপনীত হয়েছে। ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘ ইরান-ইরাক (UNIIMO) শান্তি মিশনে যোগদানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যাত্রা শুরু করে এবং এ পর্যন্ত ৪০টি দেশের ৫৪টি শান্তি মিশনে সশস্ত্র বাহিনীর দেড় লাখের বেশি সদস্য অংশগ্রহণ করে। বর্তমানে বিশ্বের আটটি দেশের নয়টি মিশনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর নারী সদস্যসহ প্রায় ৬ হাজার শান্তিরক্ষী কর্মরত রয়েছে। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শান্তিরক্ষীরা দশকের পর দশক ধরে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করছে, দেশের জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে, দেশের অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রাখছে। তবে এই অর্জনের সঙ্গে রয়েছে বিয়োগান্তর, বিসর্জন আর আত্ম উত্সর্গ; জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে এ পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনীর ১৩১ জন সদস্য নিহত হয় এবং ২১৮ জন আহত হয়। তাই সশস্ত্র বাহিনী সর্বদা দেশের আস্থায় অবিচল এবং বিশ্ব শান্তি স্থাপনে আর্ন্তজাতিকভাবে সমাদৃত।

n লেখক :উপমহাপরিচালক (বিডি-৭), সেনা কল্যাণ সংস্থা