শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২০, ২১:২৫

অনল চৌধুরী

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর প্রতিটা স্বাধীন দেশ শিল্পায়নের মাধ্যমে উন্নত করার নীতি গ্রহণ করে। চীন, জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়ার ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে শুধু শিল্পায়নের মাধ্যমেই। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় ৫০ বছর আগে। যদিও দেশে জাহাজের মতো ভারী শিল্প কারখানাও উত্পাদন এবং বিদেশে রপ্তানি করছে, তারপরও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পপণ্যের চাহিদা পূরণ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো যথেষ্ট শিল্প কারখানা গড়ে ওঠেনি।

অথচ ৮০-র দশক থেকে সরকারিভাবে এ উদ্দেশ্যে যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। শিল্প ব্যাংক নামে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং অন্যান্য ব্যাংক থেকে শিল্প কারখানা স্থাপনের জন্য ঋণ দেওয়া হলেও অধিকাংশক্ষেত্রেই সে ঋণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিজেদের কাজে লাগিয়েছে। একইসঙ্গে শুরু হয় ঋণখেলাপি হওয়ার রীতি— পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত খেলাপিঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। তবে প্রকৃত শিল্প উদ্যোক্তা বেশিরভাগ ব্যক্তিই ব্যাংক থেকে ঋণ লাভে ব্যর্থ হন।

বেশিরভাগ শিল্পপণ্য এবং কাঁচামালের জন্য বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর। দীর্ঘদিন ধরে কম্পিউটার বাংলাদেশের একটা মৌলিক চাহিদায় পরিণত হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ জাহাজ বানালেও সামান্য একটা কম্পিউটার মাউসও বানায় না। একমাত্র ইউপিএস ছাড়া কেসিং, হার্ডডিস্ক, মাদার বোর্ড, র্যাম, প্রসেসর, স্পিকার, মাইক, পেন ড্রাইভ, অ্যান্টি ভাইরাসসহ এমন কোনো কম্পিউটার সামগ্রী নেই, যেটা বাংলাদেশে উত্পাদিত হয়। প্রতি বছর এই খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি করতে হয়। শুধু ধোলাইখাল ও জিঞ্জিরার অবহেলিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা করে এসব উত্পাদনের দায়িত্ব দিলে বছরে হাজার কোটি টাকা আয় এবং প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।

একইভাবে বাংলাদেশের গাড়ি উত্পাদন ও সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান প্রগতি দীর্ঘদিন ধরে মানসম্মত যানবাহন তৈরি করে আসছে। সরকারি সব প্রতিষ্ঠান, কর্মচারী এবং সরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণে বাধ্যতামূলকভাবে প্রগতির তৈরি যানবাহন কেনার নির্দেশনা দেওয়া হলে এবং এর শেয়ার বাজারে ছাড়া হলে এই প্রতিষ্ঠানকে আরো লাভজনক এবং মিত্সুবিশি, ভলভো, টয়োটা, হিউন্দাই ও টাটার মতো বিশ্বসেরা যানবাহন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব।

সম্প্রতি ইত্তেফাকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্ত নিয়ে চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছে ভারতের। এই দ্বন্দ্বের জেরে চীনের পণ্য বয়কট করা শুরু করেছে দেশটি। আর এটি ভারতের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে এবং বিশ্ববাজারে টিকে থাকার জন্য কলকারখানা তৈরির ওপর জোর দিয়েছে ভারত। পাশাপাশি দেশটির যে সব কলকারখানা চীনা পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল সেগুলোও এখন বিকল্প দেশ থেকে প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করছে। বাংলাদেশে ব্যাপক শিল্পায়ন করা হলেও একই ঘটনা ঘটবে। সুতরাং উল্লিখিত কারাখানাগুলি স্থাপন ও পণ্য উত্পাদন শুরু করলে দেশ ও জাতি সবদিক দিয়েই লাভবান হবে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন রকম প্রচারণা চালানো হলেও বাস্তবে পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এখনো বাংলাদেশের প্রায় ৯ কোটি লোক ভূমিহীন এবং ৫ কোটি লোক বেকার। দারিদ্র্যের কারণে কাজের সন্ধানে মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়ে চরম দুর্দশায় পড়ছে। দেশে আগামী ১০০ বছরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করে যথেষ্ট কৃষিজমি সংরক্ষণ করে প্রতিটি এলাকার অবশিষ্ট অনুর্বর ও পতিত জমিতে ব্যাপকভাবে শিল্প কারখানা স্থাপন করা না হলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা বেকারত্ব নির্মূল করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।

ঢাকা