দেশে বৈধভাবে বিক্রি করা ৫৩টি উজি পিস্তলের ক্রেতাদের নাম-ঠিকানা এখনো যাচাইবাছাই করতে পারেনি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। উজি পিস্তলের ক্রেতাদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং এটি ব্যবহারের উদ্দেশ্য কী তা যাচাই করেই এসব পিস্তলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে। অস্ত্রের লাইসেন্সধারীরা এসব পিস্তল ব্যবহার করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে আগামীকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উদ্ধার করা উজি পিস্তলের লক্ষ্যভেদ দূরত্ব ৫৫ মিটার। অন্যদিকে উজি গানের লক্ষ্যভেদ দূরত্ব ১০০ মিটার। তাই আগ্নেয়াস্ত্র বিশেষজ্ঞরা এটিকে রেপ্লিকা আর্মস বলেই মনে করছেন।
গত ২০ আগস্ট রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে মিনাল শরীফ (৫৬) নামে একজনকে গ্রেপ্তারের পর তার গাড়িতে একটি অস্ত্রের লাইসেন্স পায় পুলিশ। পরে তার ধানমণ্ডির বাসায় অভিযান চালিয়ে ৪৪টি গুলিসহ একটি ‘উজি পিস্তল’ এবং বিদেশি মদ উদ্ধার করে পুলিশ। মিনাল শরীফের কাছ থেকে উদ্ধার করা লাইসেন্সে শুধু ‘পয়েন্ট টু টু বোরের রাইফেল’ কথাটি লেখা ছিল।
উজি পিস্তল সম্পর্কে আগ্নেয়াস্ত্র বিশেষজ্ঞ আবদুল হালিম বলেন, উজি পিস্তল সামরিক অস্ত্র নয়। কারণ পৃথিবীর কোনো দেশেই পয়েন্ট টু টু (এলআর) সামরিক অস্ত্র নয়। উজি পিস্তলের গুলির খালি কেসের মাপ ১৫ মিলিমিটার। আর সেটা টু টু বোর (এলআর) হলে এই ক্যাটাগরিতে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র সামরিক অস্ত্র নয়। উজি পিস্তল দেখতে একটু ভয়ংকর হলেও এই অস্ত্রের যথেষ্ট দুর্বল দিক রয়েছে। এটির বুলেট অনেক দুর্বল। এটি একটি রেপ্লিকা আর্মস। জিংক (দস্তা) দিয়ে তৈরি এর বডি খুবই দুর্বল। এর মধ্যে একটি উজি পিস্তলের বডি ভেঙে গেছে বলে তিনি জানান।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৪ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত এ ধরনের ১১১টি উজি পিস্তল আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯টি উজি পিস্তল ও চারটি উজি রাইফেলসহ মোট ৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্সের বিপরীতে বিক্রি হয়েছে। ঐ ধরনের অস্ত্র প্রথম কোনো বেসামরিক ব্যক্তির কাছে দেখেন তারা। অস্ত্রের ধরন দেখে সন্দেহ হওয়ায় মতামত নিতে সেটি সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়। পরে এটি মিলিটারি গ্রেডের অস্ত্র (সামরিক অস্ত্র) বলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে জানায় সেনাবাহিনী।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, উদ্ধার করা উজি পিস্তল সম্পর্কে একটি মতামত ডিএমপির মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ঐ মতামতটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাচাইবাছাই শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিক্রি করা ৫৩টি উজি পিস্তল কাদের কাছে আছে, তাদের নামের তালিকা জানতে চাওয়া হয়েছে। ঐ নামের তালিকা পেলে আমরা তাদের বিষয়ে খোঁজ নিতে মাঠে নামব। তিনি বলেন, আগ্নেয়াস্ত্রগুলো যেহেতু বৈধভাবে আমদানি করা হয়েছে এবং যারা কিনেছেন তারা লাইসেন্সের মাধ্যমে কিনেছেন, সেগুলোর ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে।
আগ্নেয়াস্ত্র বিশেষজ্ঞ আবদুল হালিম বলেন, এলআর (লং রাইফেল) পয়েন্ট টু টু বোর গান সবচেয়ে দুর্বল আগ্নেয়াস্ত্র। উজি পিস্তল যদি ভয়ংকর হয়, তাহলে এটার পাশে একটা উজি গান রেখে পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যাবে। উজি পিস্তলের বডি জিংকের তৈরি। বৃটিশ ইম্পেরিয়াল নিয়মে ইঞ্চি সিস্টেমে এই অস্ত্রের ক্যালিবার হলো পয়েন্ট টু টু বোর। ফ্রান্সের মিটারাল নিয়মে মিলিমিটার সিস্টেমে ফাইভ পয়েন্ট ফাইভ মিলিমিটার। তিনি বলেন, ছয়টি প্রতিষ্ঠান গত পাঁচ বছরে এ ধরনের মোট ১১১টি আগ্নেয়াস্ত্র আমদানি করেছে। সবগুলোই আনা হয়েছে পয়েন্ট টু টু বোরের (এলআর)। এগুলো জার্মানের অস্ত্র তৈরির বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ওয়ালথারের তৈরি। যদিও আগ্নেয়াস্ত্রগুলোর বডি জিংকের তৈরি। এর বডি স্টিলের তৈরি নয়। আন্ডার লাইসেন্স রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং অর্থাত্ অনুরূপভাবে তৈরি করা হয়েছে। পিস্তলের গায়ে ওয়ালথার কোম্পানির নাম লেখা থাকলেও ঐ কোম্পানি এসব আগ্নেয়াস্ত্র তৃতীয় কোনো দেশ থেকে তৈরি করেছে।
সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ও এর ব্যবহারের প্রজ্ঞাপনে ক্যালিবারের কথা লেখা থাকলেও অস্ত্রের ধরন, ম্যাগাজিন ক্যাপাসিটি, স্পেসিফিকেশন, অ্যাকশন টাইপ, ম্যাক্সিমাম ইফেক্টিভ রেঞ্জ উল্লেখ করা নেই।
উজি গান : ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উদ্ধার করা উজি পিস্তলের লক্ষ্যভেদ দূরত্ব ৫৫ মিটার। উজি গানের লক্ষ্যভেদ দূরত্ব ১০০ মিটার। উজি গান দিয়ে প্রতি মিনিটে ৯৫০টি গুলি করা যায়। আর সামরিক অস্ত্রের লক্ষ্যভেদ দূরত্ব ৩৫০ মিটার। আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ব্যবহূত ইসারেয়েল তৈরি উজি গান ৯ মিলিমিটার এবং পয়েন্ট ৪৫ ইঞ্চি ক্যালিবার। এর গুলির কেসের মাপ ৯ মিলিমিটার গুনন ১৯ মিলিমিটার। উজি গানে এক ম্যাগজিনে ৩২ রাউন্ড গুলি থাকে। বিশ্বের আর কোনো আগ্নেয়াস্ত্রে প্রতি মিনিটে এতসংখ্যক গুলি করার ক্ষমতা নেই। আরব-ইসরাইয়েল যুদ্ধে ইসরাইলিরা উজি গান ব্যবহার করে সারা বিশ্বে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
