আমার বন্ধু সৌমিত্র

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২০, ২১:৩৩

বেলভিউতে যখন সৌমিত্র ভর্তি হলেন, তখন খবর আসে আমার কাছে। আমি জানতাম তিনি ইনসেনটিভ কেয়ারে রয়েছেন এবং তার অবস্থা সংকটপূর্ণ। পরের দিনগুলো ছিল শুধুই উত্কণ্ঠার। তবে শেষ খবরটির জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। সৌমিত্র লড়াই করে ফিরবেন সেই আশাতেই দিন কাটিয়েছি। ফোনের স্ক্রিনে যখন মেসেজটি ভেসে উঠল ‘সৌমিত্রদা আর নেই’—আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। কী ক্ষতি হলো, কতটা ক্ষতি হলো সেসব বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললাম।

এর মাঝেই একের পর এক ফোন আসতে লাগল নিউজ ও মিডিয়া থেকে আমার প্রতিক্রিয়া জানতে। খুব স্বাভাবিক সেটা, কিন্তু সেই মুহূর্তে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানোর ভাষা আমার ছিল না। অপু আর অপর্ণার সেই অবিস্মরণীয় অনস্ক্রিন রোমান্সে মুগ্ধ হয়েছিল আপামর বাংলার দর্শক এবং এত বছর পরে আজও তা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। অপর্ণাকে ছাড়া অপুকে ভাবা যায় না। ছবিতে সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু হয় অপর্ণার। কিন্তু বাস্তব জীবনে স্থান-কাল-সময়নির্বিশেষে অপর্ণাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে অপুই।

যখন আপনি শোকে মুহ্যমান থাকবেন, তখন সবকিছুতে সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বর্তমানের দিকে তাকালে দেখতে পাই শুধুই ব্যস্ততা আর তাড়াহুড়ো। শুধু যে সংবাদেই ব্যস্ততা তা নয়, সবকিছুতেই কেমন এক অদ্ভুত তাড়াহুড়ো। এই প্রেক্ষাপটে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখা বেশ কঠিন। একটি ছবিতে কাজ করার সময় খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হচ্ছে আবার ছবি শেষ হয়ে পরের প্রজেক্টে যাওয়া মানে সেই তৈরি হওয়া বন্ধুত্বের সুতোয় টান। ধীরে ধীরে বিবর্ণ হতে শুরু করে সেই বন্ধুত্ব আর সম্পর্ক। ব্যস্ততার সঙ্গে বন্ধুত্ব যেন ব্যস্তানুপাতিক। কিন্তু সৌমিত্র-শর্মিলা জুটি সেই ব্যস্ততাকে উপেক্ষা করে টিকে রইল বহুকাল।

আমার আর সৌমিত্রের একসঙ্গে করা প্রথম ছবি ‘অপুর সংসার’। আমি তখন ১৩ বছরের বালিকা, সৌমিত্র ২৩ বছরের যুবক। ইউনিটে আমিই সবার ছোট ছিলাম। তাই সত্যজিত্ রায়-মানিকদা, সাউন্ড রেকর্ডিস্ট-দুর্গাদা, ডিওপি সুব্রত-কাকু হয়ে গিয়েছিলেন। সৌমিত্র চ্যাটার্জিই কেবল সৌমিত্র ছিলেন। যার সঙ্গে আমি গল্প করতে পারি, যার কাছে নিজেকে আর তাকে সমবয়সিই মনে হয়। পরে বুঝতে পেরেছিলাম, সবার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার অনন্য গুণ ছিল সৌমিত্রের।

‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ছবির শুটিংয়ের দিনগুলো আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে আজীবন। আমরা বিহারের পালামৌ অঞ্চলের জঙ্গলঘেরা একটি ছোট্ট শহরে শুটিং করছিলাম। তখন ছিল এপ্রিল মাস, প্রচণ্ড গরম, দিনের বেলা তাপমাত্রা ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি উঠে যায়। শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে আমার রুমে কুলার ছিল, এবং এই খোটা আমাকে সারাজীবন শুনতে হয়েছিল! আমরা সকালে প্রায় তিন ঘণ্টা আর বিকেলে তিন ঘণ্টা করে কাজ করেছি। মাঝের সময়টাতে শুধুই আড্ডা। মাঝেমধ্যে মানিকদা আমাদের আড্ডায় এসে পড়তেন এবং বুঝতে পারতেন সবাই তাকে দেখে সিগারেট লুকোচ্ছে। রবিদা ছিলেন মজার মানুষ। তিনি সবার একটা করে নাম দিয়েছিলেন—রবিপোড়া, শমিতভাপা, শুভেন্দুভাজা। জ্যোত্স্নাশোভিত রাতগুলোতে জঙ্গল অদ্ভুত জাদুকরী রূপ ধারণ করত। আমরা দূর থেকে ভেসে আসা হাতির ডাক আর সাঁওতালদের তবলার ধ্বনি শুনতে পেতাম। পুলিশ পোস্ট থেকে অনেকটা দূরে ছিলাম বলে দেহরক্ষী ছিল না। আমি যেখানে থাকতাম, সেখানে একবার বেশ কয়েক জন দুষ্কৃতিকারী এসে উপদ্রব করছিল। সৌমিত্র এবং আরো কয়েক জন ওদের তাড়িয়ে দেয়। সেই সব প্রিয় মানুষের অনেকেই চলে গেছেন। কাবেরীদি, রবিদা, শমিত, শুভেন্দু, মানিকদা আর এখন সৌমিত্র। একসঙ্গে কাটানো সেই সব দিবারাত্রির আনন্দময় মুহূর্তগুলোর স্মৃতিচারণের জন্য আর কেউ রইল না।

গৌতম ঘোষের ‘আবার অরণ্যে’ শুটিং ছিল আমাদের আরেকটি স্মৃতিময় অধ্যায়। শুভেন্দু, সৌমিত্র আর আমি ছিলাম চা-বাগানের মাঝখানে একটি বাংলোতে। শুটিংয়ের জন্য খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতে হতো, কিন্তু যতক্ষণে আমি ঘুম থেকে উঠে কফিতে চুমুক দিচ্ছিলাম, ততক্ষণে সৌমিত্র সকালের হাঁটাহাঁটি শেষ করে ফেলত আর শুভেন্দু ব্রেকফাস্ট ও ডিনারের ব্যাপারে রাঁধুনিদের দিকনির্দেশনা দিয়ে দিত। আমি শুনতে পেতাম, সৌমিত্র বারান্দায় দাঁড়িয়ে ব্যায়াম করতে করতে গান গাইছে। কাজের ফাঁকে সৌমিত্র এক টুকরো কাগজ নিয়ে ওর নাতি-নাতনিদের জন্য কবিতা লিখত। সেগুলো শোনাতও আমাকে। আমি কী বলি তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত। সেই হাসি, দীপ্ত চেহারা সব সময় মনে করায় ভীষণ পরিবারপ্রিয় মানুষ ছিলেন সৌমিত্র।

দিনের কাজ শেষে আমরা বসার ঘরে আড্ডা দিতাম। আমি যদি সেই সময়কার গল্প আড় আড্ডাগুলো রেকর্ড করে রাখতাম! সৌমিত্রের কাছ থেকে আমরা অনেক কিছুই জানতাম। আমি বেশির ভাগ সময় ছিলাম নীরব দর্শকের ভূমিকায়। থিয়েটার, শিল্প, খেলাধুলা, রাজনীতি, দর্শন, গসিপ—সবকিছুতেই সৌমিত্র অনন্য। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেছে। ব্যক্তিত্ব, রসবোধ, মূল্যবোধ—আমাদের বন্ধুত্বের ভিত্তি ছিল এগুলোই।

‘চারুলতা’ ছবির পর সৌমিত্র উঠে পড়ে লাগলেন তার হাতের লেখা সুন্দর করতে, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই লেখা পারফেক্ট না হয়! সৌমিত্র কখনোই নিজেকে এবং নিজের কাজকে বাণিজ্যিক বিবেচনায় গুরুত্ব দেননি। তিনি সব সময়ই আদর্শ এবং বন্ধুত্বের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। তার মতো মানুষ আজকাল খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর।

১৫ নভেম্বর কলকাতা যখন কবিতা, ফুল, গান, চোখের জলে বিদায় দিচ্ছিল সদাবিনয়ী মানুষটিকে, আমি অবাক হইনি। সৌমিত্র কখনোই অতীত হতে পারেন না। তিনি সব সময়ের। তার শিল্পসমৃদ্ধ কাজ, হূদয় ছুঁয়ে যাওয়া আবৃত্তি, সর্বোপরি তিনি যে সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার রেখে গেলেন, তা ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে শুধু আলোকিতই করবে না, অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবে শত-সহস্র বছর।

আমার যদি কোনো আক্ষেপ থেকে থাকে, সেটি শুধুই সৌমিত্রের রেখে যাওয়া এই উত্তারাধিকার নিয়ে। যেমনটা আক্ষেপ করেছিলাম সত্যজিত্ রায়কে নিয়ে—যে মানুষগুলো ভারতীয় সিনেমা জগেক ছাপিয়ে হয়ে উঠেছিলেন বিশ্ব সিনেমা জগতের প্রতীক। দুঃখজনকভাবে, দুই বাংলা ছাড়া বাইরের অনেক মানুষই ভারতীয় সিনেমায় সৌমিত্রের অবদান সম্পর্কে জানে না। 

সৌমিত্রের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব প্রায় ৬০ বছরের। সৌমিত্রর চলে যাওয়া তাই কতটা ক্ষতির, তা সংখ্যায় কিংবা ভাষায় বোঝানো সম্ভব নয়। রবিঠাকুরের কথায় তাকে স্মরণ করে বলব—

‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে,

বন্ধু হে আমার রয়েছ দাঁড়ায়ে’

 

n লেখক :ভারতীয় অভিনেত্রী

সূত্র :দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

ভাষান্তর :এইচ এম নাজমুল আলম