তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেমন দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে বিশ্ব তেমনি প্রযুক্তিনির্ভর সহজলভ্যতার কারণে উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলছে সাইবার অপরাধ। ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া প্রতিটি জনপদ ও প্রতিটি জনমনে পৌঁছে যাওয়ার কারণে বাস্তব জীবনে ঘটমান অপরাধগুলো এখন স্থানান্তরিত হয়ে রূপ নিয়েছে ডিজিটালে। প্রতিনিয়ত তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে সমান্তরাল হারে ঘটছে সহিংস উগ্রবাদ, গুজব, হয়রানি, হুমকি, রাজনৈতিক অপপ্রচার, গ্যাং কালচার, আত্মহত্যা, পর্নোগ্রাফি, সাইবার বুলিং, জালিয়াতি, চাঁদাবাজি, পাইরেসি ইত্যাদি—যা সাইবার অপরাধের অন্তর্ভুক্ত। তথ্যপ্রযুক্তির জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব, ইমু, ইনস্টাগ্রাম, ওয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদির মাধ্যমে এ অপরাধগুলো সংঘঠিত হচ্ছে বেশি। সম্প্রতি পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডব্লিউ) পেজ চালুর দুই দিনেই ৬৯১টি অভিযোগ জমা পড়েছে। ভুক্তভোগীরা ব্ল্যাকমেইলিং, পর্নোগ্রাফি, আইডি হ্যাকড ও হুমকি দেওয়ার মতো বিভিন্ন অভিযোগ করছেন বলে একাধিক সংবাদমাধ্যমে আসছে।
বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের গত বছরে এক গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে—বর্তমানে দেশে যত অপরাধ হচ্ছে তার ৭০ শতাংশের শিকার হচ্ছেন কিশোরীরা। বিভিন্ন হুমকি, যৌন হয়রানি কিংবা সম্পর্কে একটু মনোমালিন্য হলেই কিশোরীর আপত্তিকর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করছে তরুণরা। প্রযুক্তি ব্যবহারকারীরা ১১ ধাপে সাইবার অপরাধের স্বীকার হচ্ছেন। এর মধ্যে চারটিই নতুন। ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ নারী। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের শিকারে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছেন তারা। এই অপরাধের শিকার ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অনলাইন বার্তা পাঠিয়ে হুমকি। ছবি বিকৃত করে অনলাইন অপপ্রচারে শিকার হওয়া নারীর হার ১১ দশমিক ২ শতাংশ। জরিপে আরো বলা হচ্ছে পর্নোগ্রাফিকেন্দ্রিক অপরাধ ২ দশমিক ২৫ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ০৫ শতাংশে এবং অনলাইন বার্তা পাঠিয়ে হুমকির ঘটনা ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে গেছে ১৭ দশমিক ৬৭ শতাংশে।
বর্তমান সময়ে উঠতি বয়সি অনেক তরুণ-তরুণীরাও সাইবার অপরাধ সম্পর্কে বেশ অজ্ঞ। যার ফলে তারা অবিরত বিভিন্ন তথ্য যাচাই না করেই গুজব শেয়ার, রাষ্ট্র বা ব্যক্তির নামে আপত্তিকর স্ট্যাটাস বা মন্তব্য, যৌন হয়রানি ও হুমকিসহ বিভিন্ন সাইবার অপরাধ করছে। এতে এক দিকে যেমন ভুক্তভোগী হয়রানির স্বীকার হচ্ছেন অপর দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বিপাকে পড়ছেন। সুতরাং এক্ষেত্রে সর্বসাধারণের মধ্যে জনসচেতনতা তৈরি খুবই জরুরি। প্রয়োজনে গণমাধ্যম ও সংবাদপত্র এক্ষেত্রে শুভ সহায়ক হতে পারে।
একই সঙ্গে আমরা যারা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করছি, তাদের স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে—ইচ্ছাকৃতভাবে বা একটু অসচেতনতাবশত বিভিন্ন গুজব শেয়ার, ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের নামে অপপ্রচার বা মানহানিকর তথ্য ছড়ানো, মেয়েদের যৌন হয়রানি বা আপত্তিকর ছবি ভাইরাল ইত্যাদি করলেই সাইবার অপরাধের দায়ে ফেঁসে যেতে পারেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। আর জেনে বা না বুঝে এ অপরাধ করে ফেললে দিতে হবে কঠিন মাশুল। তাই অনলাইন ব্যবহারে আমাদের সচেতনতা বা সাবধানতা অবলম্বনের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে সন্তান প্রযুক্তির অপব্যবহার করছে কি না সেদিকে অভিভাবক কিংবা পরিবারের সদস্যদের কড়া নজর দিতে হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
