জীবনের করুণ উপসংহার

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২০, ২১:৩৪

প্রতিটি দিন অতিবাহিত হয়ে নতুন সকালের সূচনা হয়। এভাবে দিনের পরিক্রমায় মানুষ শৈশব থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় যৌবনে। যৌবন থেকে মধ্যবয়সে। তার পরই শুরু হয় জীবনের অন্তিম পর্ব বা বার্ধক্য। মূলত এ সময়টিতে শুরু হয় জীবনের সব পাওয়া না পাওয়ার হিসাব। কেননা এ সময়ই সবার সামনে সমাজের কঠিন বাস্তব সমীকরণ ফুটে ওঠে। এই সমীকরণ মিলে গেলে জীবন সুন্দর। আর যদি এই সমীকরণ অসংজ্ঞায়িত হয় তবে জীবনে নেমে আসে শুধুই শূন্যতা।

বার্ধক্য জীবনের শেষ পর্যায়ের স্বাভাবিক পালাবদল। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ষাটোর্ধ্ব বা তার বেশি বয়সি ব্যক্তিকে প্রবীণ হিসেবে গণ্য করা হয়। এক জন ব্যক্তি যখন বার্ধক্যে পা দেন, তখন তার শারীরিক অসমর্থ, অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা, অসহায়ত্ব এবং নানা কারণে মানসিকভাবে বিপর্যয় ঘটে। এছাড়া বার্ধক্যজনিত রোগ তো আছেই।

এই বয়সি মানুষের প্রতি পরিবারের সহনশীল হওয়া উচিত। ঠিক যেমন এক সময় তারা আদর-যত্ন, মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে তাদের সন্তানদের লালনপালন করেছেন। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে আর্তনাদ, চিত্কার, নিঃসঙ্গতা ও অসহায়ত্বের প্রতিধ্বনি ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। গুটিকয়েকজন বাদে বেশির ভাগই অবহেলিত। একদিকে শারীরিক অক্ষমতা ও অন্যদিকে পরিবারের মানুষের অবহেলায় তারা বেঁচে থাকার চেয়ে বরং মৃত্যু কামনা করেন। পরনির্ভরশীলতার কারণে তারা নিজেকে পরিবার বা সমাজের বোঝা মনে করেন। কারণ শারীরিক অক্ষমতা ও পরনির্ভরশীলতার দোহাই দিয়ে তাদের প্রতিনিয়ত বোঝা ভাবতে বাধ্য করা হয়। মা-বাবা সারাজীবন সন্তানদের জন্য কী না করে। এক জন মা গর্ভধারণ করার পর প্রতিটি পদে পদে সন্তানকে সযত্নে বুকে আগলে রাখেন। শত কষ্ট সহ্য করে সন্তানকে তা বুঝতে দেন না। সন্তানের গায়ে বিন্দু পরিমাণ আঁচড়ও লাগতে দেন না। বাবাও নেমে পড়েন আয় উপার্জনের কাজে। হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে পূরণ করেন সন্তানের আবদার। কারণ বাবা-মার ভালোবাসা সন্তানের মতো দায়বদ্ধ নয়।

সারাজীবনের সব সম্বল দিয়ে সন্তানকে লালনপালন করার পর বৃদ্ধ বয়সে সেই সন্তান তার স্ত্রী কর্তৃক প্রতিফলিত হয়ে বাবা-মার প্রতি অন্যায় করেন। সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে বাবা-মার সঙ্গে বিরোধ করেন। অনেকে আবার এর জের ধরে বাবা-মায়ের দায়িত্ব দূরের কথা তাদের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে। অনেকে বাবা-মাকে নিজেদের সঙ্গে রাখেন তার বাচ্চা পালনসহ সংসারের কাজ করার জন্য আবার কোনো কোনো বাবা-মায়ের শেষ আশ্রয় হয় বৃদ্ধাশ্রম। এমনও দেখা যায়, শেষ বয়সে বাবা-মার দায়িত্ব ভাগাভাগি করে বাবা-মাকে আলাদা করে দেওয়া হয়। মানুষ কতোটা অসহায় এসব বয়স্ক মানুষের চেহারায় স্পষ্ট বোঝা যায়।

পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ নামের একটি আইন রয়েছে দেশে। এই আইন অনুযায়ী বৃদ্ধ ও কর্মহীন বাবা-মা তার সন্তানের কাছ থেকে অধিকার আদায় করতে পারেন। এই আইনে প্রত্যেক কর্মক্ষম সন্তানকে তার মা-বাবার ভরণ-পোষণের নিশ্চয়তা দিতে হবে বলে বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার একই সঙ্গে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সন্তান তার পিতা বা মাতাকে বা উভয়কে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধনিবাস কিংবা অন্য কোথাও একত্রে বা আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করবে না। কিন্তু ঐ যে বাবা-মা তো বাবা-মা যাদের কোনো তুলনা হয় না।

আমাদের এখন কাজ করার মতো শক্তি আছে, পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার মতো ক্ষমতা আছে।  কিন্তু সেই ক্ষমতার দাপটে আমরা যেন ভুলে না যাই আজকের নবীন ভবিষ্যতের প্রবীণ একসময় আমাদের হাড্ডিসারও ভঙ্গুর হয়ে যাবে। প্রচুর অর্থবিত্ত থাকার পরও অন্যের ওপর নির্ভর করে বাঁচতে হবে। তাই পরিবারে শিশুদের সামনে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি এমন কোনো আচরণ না করি যাতে পরবর্তীকালে সেই শিক্ষার ভুক্তভোগী বৃদ্ধ বয়সে আমাদের হতে হয়। আমাদের বৃদ্ধ জনগোষ্ঠী এমন আহামরি কিছু চান না। একটু সম্মান, একটু নিরাপদ গৃহাশ্রয়, সামান্য কিছু খাবার, কাপড়, আর একটু বিশ্রামের নিশ্চয়তা। জীবনভর লড়ে যাওয়া শ্রান্ত শরীরে, ক্লান্ত কপালে একটু সহানুভূতিশীল হাতের ছোঁয়া। এ প্রাপ্যটুকু থেকে তাদের বঞ্চিত করবেন না। কারণ দিন শেষে আপনিও কারোর না করো বাবা অথবা মা। তাই আপনি যতটুকু আপনার বাবা-মাকে দেবেন আপনার সন্তানদের থেকে ঠিক ততটুকুই ফেরত পাবেন।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, কুষ্টিয়া