ইত্তেফাক রিপোর্ট
বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের অতিমারির কারণে বিনিয়োগ কমে যাবে ব্যাপকহারে। সার্বিক সরবরাহ চেইনে মারাত্মক প্রভাব পড়ায় ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগ (এসএমই)। গতকাল ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) এক অনলাইন সেমিনারে আঙ্কটাডের বরাত দিয়ে জানানো হয়, চলতি বছর বৈশ্বিক এসএমই উদ্যোক্তাদের অর্ধেকেরই অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বিনিয়োগও কমে যাবে ৪০ শতাংশের মতো। এ পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি ও দক্ষতা উন্নয়নে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্প ও শিক্ষা খাতের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় নীতিমালার সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে দেশের কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, দক্ষতা উন্নয়নে সরকারি প্রণোদনা প্রদান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছেন।
‘নতুন কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা-প্রেক্ষিত ভবিষ্যত্ ব্যবসা-বাণিজ্য’ শীর্ষক ঐ ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম। ডিসিসিআই সভাপতি শামস মাহমুদের সভাপতিত্বে এতে শিল্পোদ্যোক্তা, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।
ডিসিসিআইর সভাপতি বলেন, দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর ১২ দশমিক ৩ শতাংশ বেকার। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে—দক্ষতার অভাবে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকার্যক্রম শেষ করার পর প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী বেকারত্ব সমস্যায় ভুগছেন। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং প্রযুক্তির উদ্ভাবনের ফলে দক্ষতা ও শ্রমবাজারের গতিপ্রকৃতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে প্রথাগত দক্ষতার পাশাপাশি নতুন পরিস্থিতি ও বাজার ব্যবস্থাপনা চাহিদার ভিত্তিতে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বাংলাদেশকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এবং এর যথাযথ বাস্তাবায়নে জোর দিতে হবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমাদের কর্মরত মোট জনগোষ্ঠীর ৫০ শতাংশকে পুনরায় দক্ষ করে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে শিল্প খাতের প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের শিক্ষা কারিকুলাম যুগোপযোগী করা এবং শিল্প ও শিক্ষা খাতের সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানান।
মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের নীতি সহায়তা প্রদান নিয়ে নতুন আঙ্গিকে ভাবতে হবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা না গেলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে টেকসই করা সম্ভব নয়। তিনি কর্মরত জনগোষ্ঠীর পুনর্দক্ষতা এবং প্রবাসী শ্রমিকের দক্ষতা বাড়ানো, প্রশিক্ষণ প্রদানকারী সরকারি প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তিখাতে ফ্রিল্যান্সারদের সহযোগিতার জন্য ব্যাংকিং কার্যক্রমের আরো সহজীকরণের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি সুদীপ্ত মুখার্জী বলেন, বাংলাদেশ দক্ষ জনবল তৈরিতে যুগোপযোগী শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনায় বেশ পিছিয়ে রয়েছে। তিনি দেশে শিক্ষাকার্যক্রম ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা আরো বেশি হারে ব্যবহারের ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কান্ট্রি ডিরেক্টর টুমো পুটিয়াইনেন বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা যুগোপযোগী করার ওপর জোর দেন। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে দেশের বেসরকারি খাতে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানান।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতি বছর ২২ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হয়, যা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ ও ব্যবসা সংকুচিত হলেও আগামী বছর নাগাদ বাংলাদেশে প্রায় ৩১ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশার কথা জানান তিনি।
এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন—ইউনিডোর আবাসিক প্রতিনিধি জাকি উজ জামান, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান দুলাল কৃষ্ণ সাহা, এ্যাঙ্করলেস বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সহযোগী ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাহাত আহামদ এবং জেনারেশন আনলিমিটেড, ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ম্যারিয়্যান ওহলার্স, ডিসিসিআইর সিনিয়র সহসভাপতি এন কে এ মোবিন প্রমুখ।
