প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেছেন, সশস্ত্র বাহিনী দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশ গঠনে আরো বেশি অবদান রাখার লক্ষ্যে পেশাগত দক্ষতা অর্জন করবে। কারণ এ দেশ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনী দিবস ২০২০ উপলক্ষ্যে টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রক্রিয়ায় ক্ষুদ্রতর পরিসর থেকে উদ্ভূত সশস্ত্র বাহিনী আজ একটি বিশাল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যগণ সততা, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম এবং পেশাগত দক্ষতায় বলীয়ান হয়ে দেশের প্রতিরক্ষা এবং দেশ গড়ার কাজে আরো বেশি অবদান রাখবেন পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালার কাছে এই প্রার্থনা করি।’
সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকারের পদক্ষেপসমূহের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সততা, নিষ্ঠা এবং দেশপ্রেমে বলীয়ান হয়ে তাদের প্রতিরক্ষা ও দেশ গড়ায় আরো অবদান রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, আমাদের সরকারের আমলে সশস্ত্র বাহিনীর যে আধুনিকায়ন হয়েছে অতীতে কোনো সময়েই তা হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘বিগত এক দশকে আমরা সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি শাখাকে আধুনিক সমরাস্ত্র এবং উপকরণ দ্বারা সমৃদ্ধ করেছি।’ সশস্ত্র বাহিনী এ বছর করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে প্রচলিত উত্সবের আমেজ পরিহার করে এ দিবসটি পালন করেছে। তাই, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ দিবস উপলক্ষ্যে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে তার ভাষণ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণটি গতকাল সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশন সম্প্রচার করে।
প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুটি পদাতিক ব্রিগেড, রামুতে ১০ পদাতিক ডিভিশন, সিলেটে ১৭ পদাতিক ডিভিশন, পদ্মা সেতু প্রকল্পের নিরাপত্তা ও তদারকির জন্য একটি কম্পোজিট ব্রিগেড, স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন ছাড়াও ১০টি ব্যাটালিয়ন, এনডিসি, বিপসট, এএফএমসি, এমআইএসটি, এনসিও’স একাডেমি ও বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টাল সেন্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’
মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতির বিজয়ের স্মারক হিসেবে প্রতি বছর ২১ নভেম্বর ‘সশস্ত্র বাহিনী দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৭১ সালের এই দিনে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর অকুতোভয় সদস্যগণ যৌথভাবে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণের সূচনা করলে সম্মিলিত আক্রমণের মুখে শত্রুবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।
‘মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মহান আত্মত্যাগ ও বীরত্বগাঁথা জাতি চিরদিন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নে জাতির পিতার অসামান্য ভূমিকার কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু একই সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তিনটি ঘাঁটি উদ্বোধন করেন। ভারত ও যুগোশ্লভিয়া থেকে নৌবাহিনীর জন্য যুদ্ধ জাহাজ সংগ্রহ করেন। ১৯৭৩ সালে সে সময়ের সুপারসনিক মিগ-২১ যুদ্ধবিমানসহ হেলিকপ্টার ও পরিবহন বিমান এবং এয়ার ডিফেন্স রাডারের মতো অত্যাধুনিক সরঞ্জাম বিমান বাহিনীতে সংযোজন করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাকালে দুস্থ ও অসহায় মানুষের সাহায্যার্থে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নানাবিধ কার্যক্রমও অত্যন্ত প্রশংসা কুড়িয়েছে। শেখ হাসিনা করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, বাধ্যতামূলক হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা এবং দুস্থ ও অসহায় পরিবারদের মানবিক সহায়তা প্রদানে তারা কাজ করে যাচ্ছে।
আর্ত মানবতার সেবায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল হতে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত জনপ্রতিনিধি, চিকিত্সক, শিক্ষক, বিশিষ্টজনসহ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগীকে উন্নত চিকিত্সার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করেছে। আটকে পড়া দেশি-বিদেশি নাগরিকদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ১৭টি ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। এছাড়াও বাংলাদেশ বিমান বাহিনী মালদ্বীপে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের করোনা চিকিত্সাসেবা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর একটি মেডিক্যাল টিম মালদ্বীপে প্রেরণ এবং লেবাননে সংঘটিত ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর সেখানে মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস মোকাবিলা করতে গিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন মৃত্যুবরণ করছেন। যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তিনি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং অসুস্থদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যগণ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন।’ প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ‘এ বছর জাতিসংঘের ৭৫তম বছরপূর্তিতে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আমরা আবারও সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রদানকারী দেশ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছি।’ তিনি বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় আত্মাহুতি দানকারী শান্তিরক্ষীদেরও রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চিকিত্সা বিদ্যা ক্ষেত্রে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুরুন্নাহার ফাতেমা বেগমকে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক স্বাধীনতা পদক-২০১৯’-এ ভূষিত করা হয়েছে।’
