বিক্রয়কর্মী থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক ‘গোল্ডেন মনির’

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২০, ২৩:১৩

নব্বইয়ের দশকে রাজধানীর গাউছিয়া মার্কেটে একটি কাপড়ের দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতেন মনির হোসেন। এরপর শুরু করেন ক্রোকারিজের ব্যবসা। তারপর লাগেজ ব্যবসা অর্থাত্ ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে তিনি বিভিন্ন দেশ থেকে মালামাল আনতেন। একপর্যায়ে জড়িয়ে পড়েন স্বর্ণ চোরাকারবারে। তখন তার নাম হয়ে যায় ‘গোল্ডেন মনির’। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অবৈধভাবে স্বর্ণ চোরাচালান, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভূমি দখল করে এখন তিনি হাজার কোটি টাকার মালিক। অবৈধ অস্ত্র ও মাদকসহ রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় গাড়ি ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনিরকে গ্রেফতার করেছে র্যাব।

র্যাবের মুখপাত্র ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানান, মনির হোসেনের বাসা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, চারটি গুলি, চার লিটার বিদেশি মদ, ৩২টি নকল সিল, ২০ হাজার ৫০০ সৌদি রিয়াল, ৫০১ ইউএস ডলার, ৫০০ চাইনিজ ইয়েন, ৫২০ রুপি, ১ হাজার সিঙ্গাপুরের ডলার, ২ লাখ ৮০ হাজার জাপানি ইয়েন, ৯২ হাজার মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত, হংকংয়ের ১০ ডলার, ১০ ইউএই দিরহাম, ৬৬০ থাই বাথ জব্দ করা হয়েছে। এগুলোর মূল্যমান ৮ লাখ ২৭ হাজার ৭৬৬ টাকা। এ ছাড়া ৬০০ ভরি স্বর্ণালংকার এবং নগদ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত স্বর্ণের ওজন প্রায় ৮ কেজি।

গোল্ডেন মনিরের বাসার নিচের গাড়ি পার্কিং এলাকা থেকে বিলাসবহুল দুটি প্রাডো গাড়ি পাওয়া গেছে। মনির এবং তার পরিবার গাড়ি দুটি ব্যবহার করতেন। কিন্তু গাড়ি দুটির কোনো বৈধ কাগজ তারা দেখাতে পারেনি। এর প্রতিটি গাড়ির মূল্য তিন কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া তার মালিকানাধীন অটোকার সিলেকশন নামক একটি প্রতিষ্ঠান থেকে আরো তিনটি অবৈধ গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। এই গাড়িগুলো আমদানির কোনো কাগজপত্র তিনি দেখাতে পারেননি।

অভিযান সম্পর্কে আশিক বিল্লাহ বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব-৩ এর একটি দল শুক্রবার দিবাগত রাত ১১টায় মেরুল বাড্ডা ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকায় অবস্থান নেয়। র?্যাব-৩ এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসুর নেতৃত্বে শুক্রবার মধ্যরাতে শুরু হয়ে শনিবার সকাল পর্যন্ত অভিযান চলে। অভিযানের মূল কারণ ছিল অবৈধ অস্ত্র ও মাদক। মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনির সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরে আশিক বিল্লাহ বলেন, তিনি মূলত একজন হুন্ডি ব্যবসায়ী, স্বর্ণ চোরাকারবারি এবং ভূমির দালাল। তার একটি অটোকার সিলেকশন শোরুম আছে। পাশাপাশি গাউছিয়া মার্কেটে একটি স্বর্ণের দোকানের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে।

মনিরের উত্থান সম্পর্কে র?্যাবের মুখপাত্র বলেন, নব্বইয়ের দশকে গাউছিয়া মার্কেটের একটি কাপড়ের দোকানের বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতেন মনির। এরপর রাজধানীর মৌচাকের একটি ক্রোকারিজ দোকানে তিনি কাজ নেন। সে সময় এক লাগেজ ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিচয় হলে মনির লাগেজ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। ঢাকা-সিঙ্গাপুর-ভারত, এই রুটে তিনি প্রথমে লাগেজে করে কাপড়, কসমেটিকস, ইলেকট্রনিকস, কম্পিউটার সামগ্রী, মোবাইল, ঘড়িসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আনা-নেওয়া করতেন। এই কাজগুলো করতে করতে তিনি লাগেজ স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েন। বায়তুল  মোকাররমে একটি জুয়েলারি দোকান দেন, যা তার এই চোরাকারবারি কাজে সাহায্য করে। সময়ের ব্যবধানে মনির বড় ধরনের স্বর্ণ চোরাচালানকারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তখন তার নাম হয়ে যায় গোল্ডেন মনির।

আশিক বিল্লাহ বলেন, স্বর্ণ চোরাকারবারে জড়ানোয় ২০০৭ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। গোল্ডেন মনিরের আরেকটি পরিচয় তিনি ভূমিদস্যু। রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তার  যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। ঢাকা শহরে ডিআইটি প্রজেক্টের পাশাপাশি বাড্ডা, নিকুঞ্জ, উত্তরা ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় তার দুই শতাধিক প্লট আছে। ইতিমধ্যে তিনি তার ৩০টি প্লটের কথা র্যাবের কাছে স্বীকার করেছেন।

র্যাব কর্মকর্তা বলেন, রাজউকের কাগজপত্র জাল-জালিয়াতি করে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ করেছেন এবং স্বর্ণ চোরাচালানের মাধ্যমে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা। আমরা প্রাথমিকভাবে তার বিরুদ্ধে আরো কিছু অভিযোগ পেয়েছি। তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন, বিআরটিএ, মানি লন্ডারিংয়ের জন্য সিআইডি এবং ট্যাক্স ফাঁকি ও এ-সংক্রান্ত বিষয়ে এনবিআরকে অনুরোধ জানাব। মূলত তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ অর্থাত্ অনুমোদনবিহীন বিদেশি মুদ্রা রাখায় বাড্ডা থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা করবে র্যাব। পাশাপাশি অস্ত্র ও মাদক আইনে পৃথকভাবে আরো দুটি মামলা করা হবে।

আশিক বিল্লাহ বলেন, মূলত ফৌজদারি অপরাধের কারণে অর্থাত্ অনুমোদনবিহীন বিদেশি অস্ত্র ও মাদক রাখার অপরাধে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার এই আইনবহির্ভূত আয়-উপার্জন অর্থসম্পদের পেছনে কারা জড়িত সেটি তদন্ত করতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানাবে র্যাব। তার অর্থ-সম্পদ গড়ার পেছনে এনবিআর, বিআরটিএ, রাজউকের কোন কোন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা বা যোগসাজশ রয়েছে কি-না তাও খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে র্যাবের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গোল্ডেন মনিরের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে আমরা একটি রাজনৈতিক দল ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে জানতে পেরেছি। সেই দলটিতে তিনি অর্থের জোগান দিতেন। মনিরের বিরুদ্ধে দুটি মামলা ইতিমধ্যে চলমান রয়েছে। এর একটি মামলা হচ্ছে রাজউক সংক্রান্ত। রাজউকের ভুয়া সিল-স্বাক্ষর জালিয়াতি ভূমিদস্যুতা এবং আরেকটি হচ্ছে দুদকের একটি মামলা চলমান। এর বাইরে এখন নতুন মামলা হবে।

তবে ‘গোল্ডেন মনির’ নামে পরিচিত এই ব্যক্তি সোনা ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত থাকলেও বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি বলছে, তিনি স্বর্ণ ব্যবসায়ী নন। আশিক বিল্লাহ বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভূমি জালিয়াতি সম্পর্কে মনির বলেছেন, ২০০১ সালে তত্কালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী, গণপূর্ত কর্মকর্তা ও রাজউকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক করে তিনি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ভূমি জালিয়াতি শুরু করেন।