বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে গুরুত্বপূর্ণ অনেক রোগ নির্ণয় পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। এমআরআই মেশিন বন্ধ রয়েছে প্রায় পাঁচ বছর ধরে। এছাড়া কোবাল্ট-৬০, সিটি স্ক্যান, এনজিওগ্রাম, আলট্রাসনোগ্রামসহ রোগ নির্ণয়ের অন্যান্য যন্ত্র অকেজো হয়ে পড়ে আছে। অভিযোগ রয়েছে, এ সুযোগে হাসপাতালের আশপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো রোগীদের জিম্মি করে হাতিয়ে নিচ্ছে সর্বস্ব। হাসপাতালের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রোগীদের তাদের কাছে পাঠিয়ে প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
সম্প্রতি শেবাচিম হাসপাতালের চিকিত্সক ও ইন্টার্নদের মধ্যে ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে প্রাপ্ত কমিশন ভাগাভাগি নিয়ে হামলা-মামলা ও চিকিত্সা সেবা বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টেকনিশিয়ানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের স্টাফ ও চিকিত্সকরা এসব ডায়াগনস্টিক থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীদের কাগজ ধরিয়ে দিয়ে থাকেন। বাধ্য হয়েই তাদের কথা মতো বেসরকারি ডায়াগনস্টিক থেকে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হচ্ছে।
জানতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, এসব যন্ত্র পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল ও যান্ত্রিক ত্রুটি-বিচ্যুতি মেরামতে টেকনিশিয়ান (ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার) না থাকায় এগুলো আর সচল করা সম্ভব হয়নি। জনবল কাঠামোর তুলনায় হাসপাতালে অর্ধেক জনবলও নেই। দক্ষ টেকনিশিয়ান চেয়ে বার বার আবেদন করা হলেও কর্তৃপক্ষের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল সূত্র জানায়, মুমূর্ষু রোগীর জীবন রক্ষায় বর্তমান পরিচালকের উদ্যোগে ২৮টি আইসিইউ সচল করা হলেও নির্ধারিত চিকিত্সক না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না। অত্যাধুনিক দুটি সিটি স্ক্যান মেশিন এক বছর ধরে বিকল রয়েছে। গত বছরের মার্চ মাসের শুরুর দিকে বিকল হওয়া আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন দুটি আর সচল হয়নি। এমআরআই মেশিন এক যুগ ধরে বিকল থাকায় গুরুত্বপূর্ণ এই পরীক্ষাও বন্ধ রয়েছে। ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর রেডিয়েশন দেওয়ার জন্য খুলনা এবং বরিশাল বিভাগের একমাত্র কোবাল্ট-৬০ মেশিন রয়েছে শেবাচিম হাসপাতালে। অথচ গত দুই বছর ধরে অদৃশ্য কারণে সেই মেশিনটিও বিকল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ছয়টি এক্স-রে মেশিনের মধ্যে দীর্ঘদিন থেকে চারটি মেশিন অচল। নানা সংকটের অজুহাতে দীর্ঘদিন থেকে হাসপাতালের প্যাথলজিতে হরমোন, এলার্জি ও যৌন রোগের পরীক্ষাও হয় না। ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে থাকার পর এনজিওগ্রাম মেশিন চালুর পরপরই ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আংশিক এবং গত বছরের ডিসেম্বরে তা সম্পূর্ণভাবে অচল হয়ে পড়ে। হাসপাতালের ইটিটি মেশিনটিও গত এক বছর ধরে বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। চক্ষু রোগীদের সেবায় পাঁচ বছর আগে ১২ কোটি টাকায় কেনা ল্যাসিক মেশিনটিও গত এক বছর ধরে অকেজো হয়ে রয়েছে। ছানি অপারেশনের ফেকো মেশিনটিও চার বছর ধরে বিকল।
হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট বিভাগের প্রধান ডা. আশিক দত্ত ইত্তেফাককে জানান, করোনার স্যাম্পল কালেকশনসহ ৫০ ধরনের প্যাথলজি পরীক্ষা করতে হয় তাদের। এতে টেকনোলজিস্ট রয়েছেন পাঁচ জন এবং তিনিসহ একজন মেডিক্যাল অফিসার চিকিত্সক হিসেবে রয়েছেন। অথচ বিপুল সংখ্যক রোগীর ৫০ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কমপক্ষে ৩০ জন টেকনোলজিস্ট এবং ছয় জন চিকিত্সক প্রয়োজন।
বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা বলেন, সরকারি হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা রোগ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও শেবাচিম হাসপাতালে মাত্র কয়েক ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। তিনি অবিলম্বে অকেজো মেশিনগুলো সচল করে দক্ষ জনবল নিয়োগের দাবি জানান।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. বাকির হোসেন বলেন, হাসপাতালে কোটি কোটি টাকার মেশিন আসলেও তার পরিচালনার জন্য দক্ষ টেকনিশিয়ান নেই। এছাড়া এসব মেশিনে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে ঢাকা থেকে লোক ভাড়া করে এনেও সচল করা যাচ্ছে না। দক্ষ টেকনিশিয়ান চেয়ে আবেদন করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
