সংগীত

‘ও আমার বাংলা মা তোর...’

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২০, ১৯:০৫

 

আবুল উমারাহ মুহম্মদ ফখরুদ্দীন—নামটি যতটা না পরিচিত, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি পরিচিত একটি দেশাত্মবোধক গান—‘ও আমার বাংলা মা তোর আকুল করা রূপের সুধায় হূদয় আমার যায় জুড়িয়ে...’। দুর্ভাগ্য, এই গানের কবিতার কবিকে আমরা অনেকেই চিনি না, জানি না। সাবিনা ইয়াসমিনের গান বললে সবাই স্মরণ করতে পারি! প্রখ্যাত সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলাউদ্দিন আলীর সুরে গানটি জনপ্রিয় হলেও, গানটির রচয়িতা আবুল উমারাহ মুহম্মদ ফখরুদ্দীনের নাম আমরা জানি কয়জন? তিনি গত ২৪ অক্টোবর করোনায় আক্রান্ত হয়ে আমাদের ছেড়ে যাওয়ার পর কেউ কেউ ফেসবুক স্টাটাস দিয়ে তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন। শুধুমাত্র একটি গানের কবিতার জন্য দুঃখ প্রকাশ—আহা! এমন একজন দেশপ্রেমিক গীতিকবিকে জানতাম না, অথচ গানটি কত লক্ষবার শুনেছি। এই গানে ঋতুবৈচিত্র্যের গল্প চমত্কারভাবে বর্ণনা করেছেন কবি। সঙ্গে যোগ হয়েছে যেমন সুর, তেমন কণ্ঠ। পরবর্তীকালে আবিদা সুলতানা, ফাহমিদা নবী, ফেরদৌস আরা প্রমুখ শিল্পীও গানটি  গেয়েছেন। আরেক প্রতিভাবান ও ব্যতিক্রমী সুরস্রষ্টা লাকী আখন্দের পরিচালনায় গানটির ডিভিডি হয়েছিল ২০০৬ সালে। এমন দেশপ্রেমের গানের কথা যিনি লিখেছেন তাঁর নাম এত কম উচ্চারিত হয়েছে যে, তাঁর নামের বানানে ‘ফখরুদ্দিন’ বা ‘ফখরুদ্দীন’ লেখা হয়েছে; কেউ তাঁকে ‘ওমরাহ’ কেউ ‘উমরাহ’, কেউ ‘উমারাহা’ লিখেছেন। জাগরণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ‘জাগরণের গান’ প্রকাশকালে গানটির গীতিকবিকে ২০০৯ সালে সম্মাননা প্রদান করে, যেখানে নামের বানান ‘উমারাহ’।

তিনি এ ইউ এম ফখরুদ্দীন (A U M Fakhruddin) নামে সাংবাদিকজগতে পরিচিত। ইংরেজি দৈনিক ‘বাংলাদেশ টাইমস’, ‘টেলিগ্রাফ’, ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ এবং সাপ্তাহিক ‘হলিডে’-তে কর্মজীবন পার করেছেন সাংবাদিকতা করে। ইংরেজি পত্রিকায় সাংবাদিকতার কারণে এ ইউ এম ফখরুদ্দীন অনেকটা আড়ালে পড়েছেন এবং বলা যায় নিজেকে আড়াল করে রেখেছেন সবসময়। ছিলেন আত্মপ্রচারবিমুখ। যাঁরা তাঁকে ঘনিষ্ঠভাবে চিনতেন, তাঁরা জানেন তিনি কতোটা অমায়িক ছিলেন। বাংলাভাষার গীতিকবিরা এমনই দুর্ভাগা যে, সবসময় নেপথ্যেই থেকে যান। গান পরিচিতি পায় শিল্পীর নামে। সুরকারের নামও কেউ জানতে চান না। কিন্তু মনে রাখতে হবে—গান একালে একটি যৌথ শিল্প অর্থাত্ যিনি গানের কথা সৃজন করেন, তিনি তাতে সুর সহযোগ করেন না। আর সুরারোপিত না হলে সেই গানের কথা শিল্পী কী করে তাঁর কণ্ঠে ধারণ করবেন? তাই গান গাইবার আগে তার রচয়িতা ও সুরকারের নাম বলার দায়িত্ব অবশ্যই শিল্পীর ওপর বর্তায়। গান জনপ্রিয় হওয়ার পাশাপাশি গানের নেপথ্যের মানুষেরও শ্রোতার কাছে পরিচিতি জরুরি।

আবুল উমারাহ মুহম্মদ ফখরুদ্দীনের জন্ম ১৯৪২ সালে। তাঁর গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার বাঞ্ছারামপুরের ছয়ফুল্লাকান্দি। ১৯৭১ সালে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং ‘ও আমার বাংলা মা তোর’ সেই সময়ে লেখা। তাঁর বন্ধু আলাউদ্দিন আলীর হাতে গানের কবিতাটি দিয়েছিলেন। আলাউদ্দিন আলী তখন সুরস্রষ্টা আনোয়ার পারভেজের সহকারী। আলাউদ্দিন আলীর প্রথম সুর করা গান এটি—স্বাধীনতার পর সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে বিটিভিতে প্রচার হলে ব্যাপক সাড়া পড়ে সারা দেশে।

আবুল উমারাহ মুহম্মদ ফখরুদ্দীন শুধু একটি গানের জন্যই বেঁচে থাকবেন আমাদের হূদয়ে। দেশের প্রতি কতটা দরদ থাকলে এমন গানের বাণী লেখা যায় :

ও আমার বাংলা মা তোর আকুল করা রূপের সুধায়

হূদয় আমার যায় জুড়িয়ে, ও আমার বাংলা মাগো

ফাগুনে তোর কৃষ্ণচূড়া পলাশ বনে কিসের হাসি

চৈতি রাতে উদাস সুরে রাখাল বাজায় বাঁশের বাঁশি

বোশেখে তোর রুদ্র ভয়াল কেতন উড়ায় কালবোশেখি;

জষ্ঠি মাসে বনে বনে আম-কাঁঠালের হাট বসে কি!

শ্যামল মেঘের ভেলায় চড়ে আষাঢ় নামে তোমার বুকে

শ্রাবণধারায় বর্ষাতে তুই সিনান করিস পরম সুখে

নীলাম্বরী শাড়ি প’রে শরত্ আসে ভাদর মাসে;

অঘ্রাণে তোর ধানের খেতে সোনা রঙের ফসল হাসে

রিক্ত চাষির কুঁড়েঘরে দিস মাগো তুই আঁচল ভ’রে;

পৌষ-পাবনের নবান্ন ধান আপন হাতে উজাড় ক’রে