বিশ্বের জন্য কোভিড ভ্যাকসিন কতখানি প্রয়োজন—করোনার দ্বিতীয় ঢেউ তাহা চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিতেছে। একদিকে মৃত্যুমিছিল অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখা—ইহা এক ভয়াবহ হারকিউলিস কাজ। একটি সঠিক ভ্যাকসিনই এখন একমাত্র দিশা। সমগ্র বিশ্বে বর্তমানে দুই শতাধিক কোভিড ভ্যাকসিন বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে রহিয়াছে। তবে গত সপ্তাহে বিশ্ববাসী তিনটি সুসংবাদ পাইয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না, ফাইজারের পাশাপাশি ব্রিটেনের অক্সফোর্ডের নিকট হইতে। এই টিকাসমূহ সকল পর্যায় পার করিয়া যেইভাবে মাত্র ১০ মাসের মধ্যে অনুমোদনের দোরগোড়ায় চলিয়া আসিয়াছে, তাহা কার্যত বিস্ময়কর ঘটনা। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে টিকা তৈরির এই পর্যায়ে পৌঁছাইতে গড়ে প্রায় আট বত্সর সময় লাগিয়া যায়। এইদিকে গত বুধবারে চীনের টিকাকেও সফল বলা হইয়াছে।
তবে যেই টিকাসমূহকে সফল বলা হইতেছে, সেইগুলি পাইতে গরিব দেশসমূহকে আরো অনেক দিন তীর্থের কাকের মতো বসিয়া থাকিতে হইবে। সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের একজন নীতিনির্ধারক জানাইয়াছেন, টিকার প্রথম ব্যাচ দরিদ্র দেশসমূহে যাইবার কোনো সুযোগ নাই। কারণ, শুরুর সব টিকাই অগ্রিম ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তির আওতায় বিক্রয় হইয়া গিয়াছে। ইতিমধ্যেই ১১০ কোটি ডোজ টিকা ক্রয় করিয়া লইয়াছে ধনী দেশসমূহ। আশার কথা হইল, অনুমোদিত যে কোনো করোনা টিকার সামঞ্জস্যপূর্ণ বিতরণ নিশ্চিতে ইতিমধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভ্যাক্স গঠন করিয়াছে। সবার জন্য টিকা নিশ্চিতকরণে ‘কোভ্যাক্স’কে সহযোগিতা করিতেছে ইউরোপিয়ান কমিশন। দরিদ্র দেশসমূহে করোনার টিকা সাহায্য হিসাবে ৪০ কোটি ইউরো বা ৮ কোটি ৮০ লক্ষ ডোজ টিকার সমান অবদান রাখিবে সংস্থাটি। তবে প্রয়োজনের তুলনায় ইহা কিন্তু হিমবাহের চূড়া মাত্র। আর কোভিড হইতে সকলে নিরাপদ না হওয়া অবধি এই বিশ্বের কেহই কিন্তু নিরাপদ নহেন। সুতরাং ইহা এক অতি জটিল পরিস্থিতি। তবে সেই জটিল পরিস্থিতির আড়ালেও রহিয়াছে বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। তাহা হইল, করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন কি লম্বা সময় ধরিয়া ইহার সাফল্য ধরিয়া রাখিতে পারিবে? এইচআইভির বিরুদ্ধে প্রথম ঔষধটি মৃত্যুর দুয়ার হইতে রোগীকে ফিরাইয়া আনিয়াছিল। কিন্তু সেই সাফল্য বেশিদিন স্থায়ী হয় নাই। পরবর্তী সময়ে চিকিত্সকরা যখন নূতন রোগীদের উপর ঐ জাদুকরি ঔষধটি প্রয়োগ করেন, তখন তাহা আর কোনো ভেলকি দেখাইতে পারে নাই। অর্থাত্ ঔষধটি কেবল কিছু সময়ের জন্য কাজ করিয়াছিল।
কিন্তু কেন কাজ করে নাই? অণুজীববিজ্ঞানীদের মতে, জীবাণুদের জীবত্কাল কয়েক মিনিট হইতে কয়েক ঘণ্টা অবধি হইয়া থাকে। এই সময়ের মধ্যেই তাহারা জন্ম-মৃত্যুর মধ্যে বংশবিস্তার করিয়া থাকে। আর এত অল্প সময় বিধায় ইহাদের বিবর্তনও হয় অতি দ্রুতলয়ে। ফলে কোনো ঔষধের বিরুদ্ধে একটি চতুর ভাইরাস ভালোভাবে বিবর্তিত হইয়া ঔষধ-প্রতিরোধী হইয়া যাইতে পারে। ভাইরাসের ভিতর একটি স্বতঃস্ফূর্ত মিউটেশনই মূলত ঔষধকে তাহার কার্যকারিতার পথ হইতে সরাইয়া দিতে পারে। ফলে ঔষধটি প্রয়োগের পরও একটি মিউটেন্ট ভাইরাস তাহার প্রতিলিপি তৈরি করিতে সক্ষম হয়, যাহা কিনা রোগীকে সুস্থ হইতে বাধা দেয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে বিবর্তন প্রতিরোধী ঔষধও আবিষ্কার করা সম্ভব হইয়াছে। এখন প্রশ্ন হইল, করোনা ভাইরাস কি এমনভাবে বিবর্তিত হইতে পারিবে, যাহা ভ্যাকসিনকে একপর্যায়ে অকার্যকর করিয়া ফেলিবে? সেই ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন লইয়া এত রাজনীতি এত কোলাহল এক লহমায় শূন্য হইয়া যাইবে। এই বিলিয়ন ডলারের প্রশ্নের উত্তর পাইতে আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করিতে হইবে।
