পৃথিবীতে কিছু ঘৃণ্য বস্তু বা ব্যক্তি রয়েছে, যাদের নাম শুনলেই ঘৃণায় বুক ভরে ওঠে। তেমনি ‘ধর্ষণ’ শব্দটির সঙ্গেই একধরনের ঘৃণ্য মনোভাব জড়িয়ে আছে। তাই এই শব্দটি উচ্চারণে অনেকের মতো আমারও একধরনের অস্বস্তি হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজকাল এই শব্দটির ব্যবহার এতটা বেড়েছে যে, এটি বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের মধ্যে কথাবার্তার একটি বড় অংশ হয়ে গিয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো, সম্প্রতি বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা ও উদাহরণ।
ধর্ষকের মতো ঘৃণ্য ব্যক্তি যেমন রয়েছে, তেমনি এ দেশে ধর্ষণের বিচার চেয়ে এবং সেটি বন্ধ করার দাবিতে দিনের পর দিন রাস্তায় আন্দোলন করার মতো মানুষও রয়েছে, যেটি অন্ধকারের মধ্যে এক ফালি আলোর মতো আমাদের আশার আলো দেখায়। খুব বেশি দিন হয়নি, ধর্ষণবিরোধী গণ-আন্দোলনের দাবির মুখে সরকার ধর্ষণের শাস্তি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃতু্যুদণ্ড নির্ধারণ করেছে, যেটি ১৩/১০/২০২০ তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে। কিন্তু আশঙ্কার কথা হলো, এর পর থেকে ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা আরো বেড়ে গিয়েছে। তাহলে সমস্যাটি কোথায়? সর্বোচ্চ শাস্তির কথা জেনেও ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজে লিপ্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। তার মধ্যে দুটি কারণ উল্লেখযোগ্য। এর একটি হলো নীতি-নৈতিকতার অভাব, আর অন্যটি হলো আইনের প্রতি উদাসীনতা। প্রথমটি নিয়ে আমরা মোটামুটি অবগত। সেটি নিয়ে এই মুহূর্তে বিস্তারিত আলোচনা করার সুযোগ নেই। শুধু এটুকুই বলতে পারি, একটি সভ্য জাতি হিসেবে সবচেয়ে বেশি যে গুণটি চোখে পড়ে সেটি হলো নীতিবোধ। এটি সত্যি যে, একদিনে সেটি পুরোপুরি অর্জন সম্ভব নয়। এর জন্য দীর্ঘ মেয়াদে যে পরিকল্পনা নেওয়া দরকার, সেটিও দৃশ্যমান নয়। দ্বিতীয় কারণটি নিয়ে একটু বিস্তারিত বলা যেতে পারে।
অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার যে অসুস্থ রীতি এ দেশে চালু রয়েছে, সেটি একজন ধর্ষককে আইনের প্রতি উদাসীন করে তোলে। ফলে সর্বোচ্চ শাস্তি আইনে থাকলেও সে মোটামুটি নিশ্চিত যে, আইনের মারপ্যাঁচ দিয়ে সে বের হয়ে আসতে পারবে। আর ধর্ষক যদি সামাজিক বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হয়, তাহলে তো আর কথাই নেই।
অনেকে ধর্ষকের সঙ্গে গ্রামের মাতব্বররা ধর্ষক এব ধর্ষিতার বিয়েও সম্পন্ন করে। এটা কতটুকু যৌক্তিক। বিষয়টি আরো গভীরভাবে দেখলে মনে হবে যে মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হলো, ধর্ষকের প্রতি তার যে ঘৃণা সেটি কী ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব? ধর্ষককে আইনের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ভুক্তভোগী মেয়েটিকে যখন ধর্ষকের বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়, তখন মেয়েটিকে আরো একবার চরম অপমান করা ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। বাধ্য হয়ে মেয়েটিকে সেটি মেনেও নিতে হয়। অন্যদিকে, নীতি-নৈতিকতা ও চক্ষুলজ্জা উপেক্ষা করে ধর্ষকের পরিবারপরিজনদের ক্যামেরার সামনে এই ধরনের বিয়ে নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখে মনে হয়, যেন তারা একটি খুবই মহত্ কাজ সম্পন্ন করেছে এবং সেজন্য তারা বড় কোনো জাতীয় পুরস্কারের দাবিদার। তারা যদি সেই পুরস্কারটি পেয়েও যায়, তাহলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। আমি মোটামুটি নিশ্চিত যেই মেয়েটি কারো বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করে, তার সঙ্গে সারা জীবন কাটানোর কথা সে ভুলেও চিন্তা করতে পারে না। আর যখন সামাজিক ও পারিবারিক চাপে সেই বিয়েটি তাকে করতে হয়, তখন সে আরো দ্বিগুণ মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে।
এটি স্বীকার করতেই হবে যে, ধর্ষককে আইনের ঊর্ধ্বে রাখার জন্য এবং ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকে আরো অপমান করার জন্য ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া একটি মধ্যযুগীয় কায়দা। যেটি এই আধুনিক যুগেও কার্যত চলমান। কিন্তু রাষ্ট্রের উচ্চ আদালত থেকে যখন এই ধরনের বিয়ের পক্ষে রায় দেওয়া হয়, সেটি সাধারণ মানুষকে কী বার্তা দেয়? ধর্ষণ করলে ভুক্তভোগীকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে এবং সেটি সম্পন্ন হলেই কি সব কিছুর মীমাংসা হয়ে যায়? এই সাময়িক সমাধান একজন নারীর জন্য যে কতটা অপমানজনক, আর দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব যে কতটা ভয়ানক, সেটি নিয়ে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন হলেও, যাদের এটি নিয়ে ভাববার কথা তারা কি সেটি করছে?
আমাদের এই প্রিয় দেশটিকে নিয়ে হতাশ হওয়ার অনেক বিষয় রয়েছে। কিন্তু আমার কেবলই মনে হয় এ দেশের মানুষ কোনো অন্যায়কেই দীর্ঘদিন চলতে দিতে পারে না। এর নজির বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত এবং এর পরবর্তী সময়েও আমরা অনেকবার দেখেছি। আর ভবিষ্যতেও এর ব্যত্যয় হবে না। আমাদের নতুন প্রজন্ম দেশটিকে নিয়ে যেভাবে চিন্তা করে, আমার বিশ্বাস তাদের হাত ধরে একদিন আমরা একটি সভ্য জাতি হিসেবে পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব, যখন একটিও ধর্ষণের ঘটনা ঘটবে না, নিশ্চিত হবে প্রতিটি নারীর যথোপযুক্ত মর্যাদা।
n লেখক : অধ্যাপক, বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও
প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
