রাজধানীর বাড্ডা থেকে গ্রেফতার হওয়া মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনির বিদেশে পালিয়ে থাকা রাজনৈতিক নেতাদের অর্থের জোগানদাতা ছিলেন। র্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর বর্তমানে পুলিশের রিমান্ডে আছেন মনির। উভর সংস্থার একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে বিদেশে পালিয়ে অবস্থান করা একাধিক রাজনীতিকের অর্থের উত্স ছিলেন এই মনির। পাশাপাশি দেশেও একটা রাজনৈতিক দলের ‘বড় ডোনার’ এই মনির। গতকাল রবিবারই তার বিদেশে (দুবাই) পালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই র্যাবের অভিযানে গ্রেফতার হয়েছেন। বেরিয়ে এসেছে তার অন্ধকার জগতের অনেক তথ্য। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান মো. সাঈদ নূর আলম গতকাল সাংবা?দিক?দের বলেছেন, ব্যবসায়ী মনির হোসেনের না?মে থাকা ২০০ প্ল?টের তথ্য-উপাত্ত যাচাই ক?রে ব্যবস্থা নে?বে সরকার।
এদিকে গতকাল রাজধানীর বাড্ডা থানায় করা পৃথক তিন মামলায় গাড়ি ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী মনিরের ১৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম শুনানি শেষে এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, অস্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের পৃথক তিন মামলায় তাকে সাত দিন করে ২১ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। শুনানি শেষে ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর হাকিম আবু বক্কর সিদ্দিক অস্ত্র মামলায় সাত এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনে সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে বিচারক বলেন, দুই মামলার রিমান্ড একসঙ্গে কার্যকর হবে। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর হাকিম মাসুদুর রহমান মাদক মামলায় গোল্ডেন মনিরের চার দিনের পৃথক রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
সচিবালয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর স?ঙ্গে এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রাজউকের চেয়ারম্যান সাঈদ নূর আলম বলেন, মনিরের বিষয়ে যে তথ্য এসেছে, সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন আছে। যাচাই-বাছাইয়ের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত হবে। রাজধানীর বাড্ডা, নিকেতন, কেরানীগঞ্জ, উত্তরা, নিকুঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় দুই শতাধিক প্লটের নথি পাওয়া গেছে এই গোল্ডেন মনিরের বাসা থেকে। সব মিলিয়ে তার ১ হাজার ৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন র্যাব কর্মকর্তারা। এমনকি রাজউকের সিল নকল করে জমি দখলের একটি এবং দুদকের একটা মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের চেয়ারম্যান বলেন, ‘এগুলো আমরা তদন্ত করব। তদন্তে যারা যারা শনাক্ত হবে, তাদের সবার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং আদালতে যে মামলা আছে তা চলবেই। মনিরের ২০০ প্লটের মালিক হওয়ার পেছনে রাজউকের কারো সহযোগিতা ছিল কি না—এমন প্র?শ্নে সাঈদ নূর আলম বলেন, ‘আমার ধারণা, এটা এক দিনের প্রক্রিয়া নয়, এটা দীর্ঘদিনের কাজ। আমরা এত দিনে উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি।’ রাজউকের চেয়ারম্যান বলেন, মনিরের দুর্নীতির বিষয়টি প্রথম উদ্ঘাটন হয় গত বছর। তখনই সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই ব্যবস্থা চলমান থাকবে যতক্ষণ না সর্বশেষ বিষয়টি উদ্ঘাটিত হচ্ছে।
ম?নি?রের প্লটগুলো বাতিল করা হবে কি না, জানতে চাইলে রাজউকের চেয়ারম্যান বলেন, ‘এ প্রক্রিয়ায় যদি কোনো প্রকার ইয়ে (অনিয়ম-দুর্নীতি) থাকে, তাহলে আমরা অবশ্যই বাতিল করব।’ অনিয়ম রোধে রাজউকে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা হবে জানিয়ে সাঈদ নূর আলম বলেন, ‘নতুন করে আরো শুদ্ধি অভিযান আমরা পরিচালনা করব। সেই পরিকল্পনা আমাদের আছে। ভবিষ্যতে কোনো প্রকার অনিয়ম থাকবে না।’
অন্যদিকে মনিরকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তাদের একটি সূত্র জানিয়েছে, দেশেই একটি রাজনৈতিক দলের বড় অর্থ জোগানদাতা ছিলেন মনির। পাশাপাশি বিদেশে পালিয়ে থাকা একটি রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতাকে নিয়মিত অর্থ পাঠাতেন মনির। এছাড়া নিজেও বহুবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘মনির আমাদের কাছে স্বীকার করেছেন, তিনি মাস্তি করতে বিদেশে যেতেন। ররিবার (গতকাল) তার দুবাই যাওয়ার কথা ছিল। অনেক দিন বিদেশ ভ্রমণ না করতে পারার কারণে এই ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তবে এবার বিদেশ গেলে আর দেশে না-ও ফিরতে পারতেন এই স্বর্ণ চোরাকারবারি। এছাড়া বিদেশে তিনি কাদের কাছে টাকা পাঠাতেন, সেই তথ্যগুলো রিমান্ডে জানতে চাওয়া হবে। বিদেশে টাকা পাচার করেছেন কি না, সে ব্যাপারেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে ফুলেফেঁপে ওঠা এই ব্যবসায়ীকে।’
র?্যাবের মুখপাত্র ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা গ্রেফতারের পর তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছি। এখন পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। পাশাপাশি আমরা চারটি সংস্থাকে তার বিষয়ে তদন্ত করার জন্য অনুরোধ করেছি। আশা করি তদন্ত করে তারা ব্যবস্থা নেবে।’
রাজধানীর মেরুল বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকার বাসা থেকে মনিরকে গ্রেফতার করে র্যাব। নব্বইয়ের দশকে রাজধানীর গাউছিয়া মার্কেটে একটি কাপড়ের দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতেন এই মনির হোসেন। এরপর লাগেজ ব্যবসা, অর্থাত্ ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে তিনি বিভিন্ন দেশ থেকে মালামাল আনতেন। একপর্যায়ে জড়িয়ে পড়েন স্বর্ণ চোরাকারবারে। তখন তার নাম হয়ে যায় ‘গোল্ডেন মনির’। অবৈধভাবে স্বর্ণ চোরাচালান, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভূমি দখল করে এখন তিনি হাজার কোটি টাকার মালিক।
তার বাসা থেকে বিদেশি একটি পিস্তল, গুলি, বিদেশি মদ, ৩২টি নকল সিল, বিদেশি মুদ্রা এবং ৬০০ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত স্বর্ণের ওজন আট কেজির মতো হবে।
