অর্থ পাচারকারীদের নামের পূর্ণাঙ্গ তালিকা চেয়েছে হাইকোর্ট। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, সরকারি কর্মচারীসহ যারাই অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত তাদের পূর্ণ ঠিকানাসহ এই তালিকা দাখিল করতে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সকল সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। আগামী ১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে দুদক চেয়ারম্যান, পররাষ্ট্র সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে (এনবিআর) ঐ তালিকা আদালতে দাখিল করতে হবে। ‘বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের মধ্যে সরকারি কর্মচারীরাই বেশি’-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্য নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ভার্চুয়াল ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল রবিবার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই আদেশ দেন।
হাইকোর্ট বলে, পত্রিকায় আসছে বিপুল পরিমাণ টাকা অবৈধভাবে কানাডা, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে চলে গেছে। এদের অধিকাংশই সরকারি কর্মচারী। এইসব দেশে যারা অর্থ পাচার করেছে তাদের নামধাম কী তা জানা দরকার। এই অর্থ পাচারকারীরা দেশ ও জাতির শত্রু। এরা দেশ ও জাতির সঙ্গে বেইমানি করছে বলে আমরা মনে করি। কারণ দেশে পড়াশোনা করে দেশের মাটিতে থেকে দেশের বাইরে টাকা পাচার করবে, এটা কী বেইমানি নয়? এ ধরনের দুর্বৃত্তদের আমরা সহ্য করব না।
এদিকে বুধবার রাজধানীতে ‘মিট দ্যা রিপোর্টার্স’ অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের মধ্যে রাজনীতিবিদরা নন, সরকারি কর্মচারীরাই বেশি। গোপনে কানাডার টরন্টোতে অবস্থিত বাংলাদেশিদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমার ধারণা ছিল রাজনীতিবিদদের সংখ্যা বেশি হবে, কিন্তু আমার কাছে যে তথ্য এসেছে, যদিও এটি সামগ্রিক তথ্য নয়, সেটিতে আমি অবাক হয়েছি। সংখ্যার দিক থেকে আমাদের অনেক সরকারি কর্মচারীর বাড়িঘর সেখানে বেশি আছে এবং তাদের ছেলেমেয়েরা সেখানে থাকে।’ তিনি বলেন, ‘আমার কাছে ২৮টি কেস এসেছে এবং এর মধ্যে রাজনীতিবিদ হলেন চার জন। এ ছাড়া কিছু আছেন আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পের ব্যবসায়ী। আমরা আরো তথ্য সংগ্রহ করছি। তবে পাচারে শুধু কানাডা নয়, মালয়েশিয়াতেও একই অবস্থা। তবে তথ্য পাওয়া খুব কঠিন। বিভিন্ন মিডিয়ায় যে তথ্য বের হয়, হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে, আসলে সংখ্যাটি তত নয়।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য পরদিন দৈনিক ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত ঐ প্রতিবেদনের অংশ বিশেষ তুলে ধরে দুদক কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে হাইকোর্ট। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, পত্রিকা দেখেছেন, অর্থ পাচারের খবরগুলো আসছে। বিপুল পরিমাণ টাকা দেশের বাইরে চলে গেছে ও যাচ্ছে। অবৈধ পথে এই যে টাকাগুলো নিয়ে চলে যাচ্ছে তাদের নাম ঠিকানা কী সেটা জানা দরকার। তারা কীভাবে অর্থ পাচার করল, কীভাবে বিদেশে বাড়ি তৈরি করল এটা জানা দরকার। যদি না জানি তাহলে তো অপরাধ কমানো যাবে না। এ জন্য এগুলো আমাদের দেখা দরকার।
এ পর্যায়ে দুদক কৌঁসুলি বলেন, অর্থ পাচার এখন কালচার (সংস্কৃতি) হয়ে গেছে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম বলেন, দেশের মাটিতে থাকব, দেশে পড়াশোনা করব, কিন্তু আলটিমেটলি দেশ ও দেশের জনগণকে ঠকিয়ে দেশের টাকা বিদেশে পাচার করবে, এটা হতে পারে না। দেশের প্রতি যদি কারো ন্যূনতম ভালোবাসা থাকে তাহলে সে এটা কখনো করতে পারে না। বিচারপতি বলেন, এভাবে তো আমরা দুর্বৃত্তদের অ্যালাউ করতে পারি না। দেশের টাকা দেশের বাইরে অবৈধ পথে চলে যাবে, এগুলো বন্ধে আমাদের অনেকগুলো আইনগত সংস্থা আছে, কোর্ট আছে। এই অর্থ পাচার বন্ধে আমাদের অবশ্যই কাজ করতে হবে। যদি আমরা এ ধরনের দুর্নীতি রোধে মনোযোগ না দিই, সবাই যদি কাজ না করি দেশকে উন্নত করার জন্য, কীভাবে দেশ উন্নত হবে। আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করতে চাই দেশ ও দেশের মানুষের জন্য। সে লক্ষ্য নিয়েই এগুতে হবে। বন্ধ করতে হবে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অপরাধ।
এরপরই হাইকোর্ট অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িতদের পূর্ণাঙ্গ নামের তালিকা দাখিলের নির্দেশ দেয়। একইসঙ্গে অবৈধ পন্থায় টাকা বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত। এ ছাড়া প্রচলিত আইন লঙ্ঘন করে অর্থপাচারকারী সরকারি কর্মচারী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, ব্যাংক কর্মকর্তা ও অন্যান্যদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে। দুদক চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদেরকে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আদেশ দানের শেষ পর্যায়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আসিফ হোসেন আদালতে বলেন, পাচারের অর্থে কানাডায় বেগম পাড়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা পাড়ার কথা শোনা যায়। আদালত বলেন, আমরা তালিকা চেয়েছি। তালিকা আসুক। দেখি কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আসে। এ সময় আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মাহজাবীন রব্বানী দীপা উপস্থিত ছিলেন।
